অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 5 ‘ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ’, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5

অধ্যায় 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. 19 শতকে বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনে রাজা রামমোহন রায় এবং ব্রাহ্মসমাজের অবদান বিস্তারিত আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
ভূমিকা: 19 শতকের বাংলায় সমাজ ও ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রধান রূপকার ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। হিন্দু সমাজের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার দূর করতে তিনি 1828 খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সারা জীবন নিরলস সংগ্রাম করে যান।

সমাজ সংস্কারে রামমোহন রায়ের অবদান:

  • সতীদাহ প্রথা রদ: তাঁর সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো সতীদাহ প্রথার মতো অমানবিক প্রথা রদ করা। তিনি প্রাচীন শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে সতীদাহ প্রথা ধর্মসম্মত নয়। তাঁর প্রবল আন্দোলনের ফলেই লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক 1829 খ্রিস্টাব্দে আইন করে এই প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন।
  • নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা: তিনি নারীদের সম্পত্তির অধিকার, নারী শিক্ষা বিস্তার এবং বহুবিবাহ প্রথার তীব্র বিরোধিতা করে নারীদের সমাজে সম্মানজনক স্থান ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
  • জাতিভেদ ও মূর্তিপূজার বিরোধিতা: ব্রাহ্মসমাজের মাধ্যমে তিনি এক ঈশ্বরবাদের (একেশ্বরবাদ) প্রচার করেন এবং হিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা ও মূর্তিপূজার তীব্র বিরোধিতা করেন।
  • জনমত গঠন: নিজের মতাদর্শ প্রচারের জন্য তিনি ‘সংবাদ কৌমুদী’ এবং ‘মিরাত-উল-আকবর’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করে আধুনিক জনমত গড়ে তোলেন।

উপসংহার: রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের প্রবল বাধা ও হুমকির মুখে দাঁড়িয়েও তিনি যেভাবে সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করার পথ দেখিয়েছিলেন, তার জন্যই তাঁকে ‘ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষ’ বা ‘ভারতের নবজাগরণের জনক’ বলা হয়।

2. নারী শিক্ষা বিস্তার এবং বিধবা বিবাহ প্রচলনের ক্ষেত্রে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান মূল্যায়ন করো।

উত্তর দেখো
ভূমিকা: 19 শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলনের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। হিন্দু সমাজের অবহেলিত নারীদের মুক্তির জন্য তিনি মূলত দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন— বিধবা বিবাহ প্রচলন এবং নারী শিক্ষা বিস্তার।

বিধবা বিবাহ প্রচলন:

  • শাস্ত্রীয় যুক্তি: তৎকালীন সমাজে বাল্যবিধবার সংখ্যা ছিল প্রচুর এবং তাদের জীবন ছিল চরম নরকতুল্য। বিদ্যাসাগর মশাই ‘পরাশর সংহিতা’ থেকে প্রমাণ করেন যে, বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত।
  • আইন প্রণয়ন: তাঁর লেখা পুস্তিকা, প্রবল আন্দোলন এবং প্রায় এক হাজার মানুষের স্বাক্ষরিত আবেদনপত্রের চাপে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে 1856 খ্রিস্টাব্দে ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ পাস করে।
  • দৃষ্টান্ত স্থাপন: শুধু আইন করেই তিনি থেমে থাকেননি, নিজ ব্যয়ে বহু বিধবার বিবাহ দেন এবং নিজের একমাত্র পুত্রের সাথেও এক বিধবার বিবাহ দিয়ে সমাজে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

নারী শিক্ষা বিস্তার:

  • বিদ্যাসাগর বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া নারীদের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। তিনি জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন সাহেবের সহায়তায় 1849 খ্রিস্টাব্দে মেয়েদের জন্য ‘বেথুন স্কুল’ (বর্তমানে বেথুন কলেজ) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
  • তিনি বাংলার বিভিন্ন জেলায় নিজ উদ্যোগে এবং নিজের খরচে প্রায় 35 টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন, যেখানে প্রায় 1300 ছাত্রী পড়াশোনা করত।

উপসংহার: বিদ্যাসাগরের এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ ও অদম্য সাহসের ফলেই বাংলার সমাজ চরম গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আধুনিকতার পথে পা বাড়াতে পেরেছিল।

3. সাঁওতাল বিদ্রোহের (1855) প্রধান কারণগুলি কী কী ছিল? এই বিদ্রোহের ফলাফল বা গুরুত্ব আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
ভূমিকা: 1855 খ্রিস্টাব্দে সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবের নেতৃত্বে দামিন-ই-কোহ অঞ্চলে সাঁওতালরা মহাজন, জমিদার এবং ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে এক প্রবল গণবিদ্রোহ গড়ে তুলেছিল, যা ‘হুল’ বা সাঁওতাল বিদ্রোহ নামে পরিচিত।

বিদ্রোহের প্রধান কারণসমূহ:

  • দিকুদের শোষণ: সাঁওতালরা বহিরাগত মহাজন ও ব্যবসায়ীদের ‘দিকু’ বলত। এই দিকুরা সাঁওতালদের চড়া সুদে (50% থেকে 500% পর্যন্ত) টাকা ধার দিত। ঋণ শোধ করতে না পারলে তারা সাঁওতালদের জমি, ফসল এবং গবাদি পশু কেড়ে নিত।
  • ওজনে কারচুপি: ব্যবসায়ীরা কেনার সময় ভারী বাটখারা (‘কেনারাম’) এবং বিক্রির সময় হালকা বাটখারা (‘বেচারাম’) ব্যবহার করে সাঁওতালদের চরম ঠকাত।
  • রেলপথ নির্মাণে অত্যাচার: ব্রিটিশ ঠিকাদাররা সাঁওতালদের দিয়ে জোর করে এবং বিনা মজুরিতে রেলপথ নির্মাণের কাজ করাত। কাজে আপত্তি করলে তাদের ওপর চরম শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো।
  • পুলিশ ও প্রশাসনের দুর্নীতি: সাঁওতালরা এই শোষণের বিরুদ্ধে আদালতে বা পুলিশের কাছে গেলে কোনো বিচার পেত না, কারণ পুলিশ ও সরকারি আধিকারিকরা ঘুষ খেয়ে মহাজনদের পক্ষ নিত।

ফলাফল ও গুরুত্ব:

  • ব্রিটিশ সরকার কঠোর হাতে এই বিদ্রোহ দমন করলেও তারা বুঝতে পারে যে সাঁওতালদের ক্ষোভের কারণগুলি সত্য।
  • সাঁওতালদের নিয়ে আলাদা ‘সাঁওতাল পরগনা’ জেলা গঠন করা হয়।
  • আইন করে বহিরাগতদের (‘দিকু’) সাঁওতাল পরগনায় প্রবেশ এবং জমি কেনায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, যাতে সাঁওতালরা তাদের জমি ও নিজস্ব সংস্কৃতি বজায় রাখতে পারে।

4. 1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ বা সিপাহি বিদ্রোহের প্রধান কারণগুলি (রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক) বিস্তারিত আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
ভূমিকা: 1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। দীর্ঘ 100 বছরের ব্রিটিশ শাসনে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মনে যে বিপুল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষোভ জমা হয়েছিল, তারই বিস্ফোরণ ছিল এই বিদ্রোহ।

রাজনৈতিক কারণ:

  • লর্ড ডালহৌসির ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ প্রয়োগ করে ঝাঁসি, সম্বলপুর, সিতারা প্রভৃতি রাজ্য অন্যায়ভাবে দখল করা হলে দেশীয় রাজারা ব্রিটিশদের ঘোর শত্রুতে পরিণত হন।
  • কুশাসনের অজুহাতে অযোধ্যা দখল, মুঘল সম্রাটের সম্মানহানি এবং নানা সাহেবের পেনশন বন্ধ করে দেওয়া চরম রাজনৈতিক ক্ষোভের জন্ম দেয়।

অর্থনৈতিক কারণ:

  • চিরস্থায়ী ও রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে চড়া রাজস্বের চাপে এবং মহাজনদের শোষণে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়েছিল।
  • ব্রিটিশদের অসম শুল্ক নীতি এবং কারখানায় তৈরি সস্তা পণ্যের ফলে ভারতের বিশ্ববিখ্যাত হস্ত ও তাঁতশিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ কারিগর কর্মহীন হয়ে পড়ে।
  • ডালহৌসির ‘ইনাম কমিশন’ বহু জমিদার ও পিরোত্তরের নিষ্কর জমি বাজেয়াপ্ত করে।

সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ:

  • সতীদাহ প্রথা রদ (1829), বিধবা বিবাহ আইন (1856) এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারকে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ তাদের ধর্মের ওপর আঘাত বলে মনে করেছিল।
  • খ্রিস্টান মিশনারিদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ এবং ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশদের চরম বর্ণবিদ্বেষমূলক আচরণ সাধারণ মানুষের মনে প্রবল ঘৃণা ও ভীতির সঞ্চার করেছিল।

সামরিক ও প্রত্যক্ষ কারণ: সিপাহিদের মধ্যে বেতন ও পদোন্নতিতে চরম বৈষম্য ছিল। এর সাথে 1857 সালে সেনাবাহিনীতে নতুন ‘এনফিল্ড রাইফেল’ চালু হয়, যার টোটায় গরু ও শূকরের চর্বি মেশানো আছে বলে গুজব ছড়ায়। এই ধর্মীয় আঘাতেই সিপাহিরা ক্ষিপ্ত হয়ে বিদ্রোহ শুরু করে দেয়।

5. 1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ কেন ব্যর্থ হয়েছিল? ভারতের ইতিহাসে এই বিদ্রোহের ফলাফল বা গুরুত্ব কী ছিল?

উত্তর দেখো
মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ:

  • কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাব: নানা সাহেব, রানি লক্ষ্মীবাই, তাঁতিয়া তোপীর মতো বীর নেতারা নিজ নিজ অঞ্চলে বিদ্রোহ চালালেও, সর্বভারতীয় স্তরে সমগ্র বিদ্রোহকে পরিচালনা করার মতো কোনো যোগ্য ও শক্তিশালী নেতা ছিল না। মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ অত্যন্ত বৃদ্ধ ও দুর্বল ছিলেন।
  • পরিকল্পনা ও ঐক্যের অভাব: বিদ্রোহীদের কোনো সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা জাতীয় আদর্শ ছিল না। সবাই নিজের নিজের রাজ্য ও স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই লড়ছিল।
  • আধুনিক অস্ত্রের অভাব: ব্রিটিশদের কাছে যেখানে উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র ও টেলিগ্রাফের মতো যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল, সেখানে বিদ্রোহীরা মূলত পুরোনো তলোয়ার ও বর্শা নিয়ে লড়েছিল।
  • শিক্ষিত সমাজ ও দেশীয় রাজাদের অসহযোগিতা: বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এবং ভারতের বহু দেশীয় রাজা (যেমন- সিন্ধিয়া, হোলকার, নিজাম) এই বিদ্রোহকে সমর্থন তো করেইনি, উল্টে ব্রিটিশদের সর্বতোভাবে সাহায্য করেছিল।

ফলাফল ও গুরুত্ব:
বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও ভারতের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম:

  • কোম্পানির শাসনের অবসান: 1858 সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির 100 বছরের শাসনের পাকাপাকি অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুট (মহারানি ভিক্টোরিয়া)-এর হাতে চলে যায়।
  • মহারানির ঘোষণাপত্র (1858): এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তারা ভারতে আর রাজ্য বিস্তার করবে না এবং ভারতীয়দের ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
  • জাতীয়তাবাদের উন্মেষ: মহাবিদ্রোহের বীর শহিদদের আত্মত্যাগ পরবর্তীকালে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মনে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের গভীর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। ভি. ডি. সাভারকরের মতে, এটিই ছিল ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’।

6. বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলন বা ‘বারাসাত বিদ্রোহ’-এ মীর নিসার আলি বা তিতুমিরের ভূমিকা আলোচনা করো। এই বিদ্রোহের পরিণতি কী হয়েছিল?

উত্তর দেখো
ভূমিকা: 19 শতকের প্রথমার্ধে আরবের ওয়াহাবি আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে মীর নিসার আলি বা তিতুমির বাংলায় যে আন্দোলন শুরু করেন, তা ধর্মীয় সংস্কারের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক ব্যাপক কৃষক বিদ্রোহে পরিণত হয়। এটিই ইতিহাসে ‘বারাসাত বিদ্রোহ’ (1831) নামে পরিচিত।

তিতুমিরের ভূমিকা:

  • কৃষকদের সংঘবদ্ধকরণ: তিতুমির দরিদ্র মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু কৃষকদের অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি প্রচার করেন যে, সকলেই সমান এবং জমিদারদের বেআইনি কর দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
  • জমিদার ও নীলকরদের বিরোধিতা: স্থানীয় হিন্দু জমিদাররা (যেমন- পুঁড়ুর জমিদার কৃষ্ণদেব রায়) ওয়াহাবিদের দাড়ি রাখার ওপর বেআইনি কর চাপালে তিতুমির তার তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং নীলকর সাহেবদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।
  • বাঁশের কেল্লা নির্মাণ: ব্রিটিশ পুলিশ এবং জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য তিতুমির বারাসাতের কাছে নারকেলবেড়িয়া গ্রামে একটি শক্তিশালী ‘বাঁশের কেল্লা’ নির্মাণ করেন এবং নিজের একটি লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তোলেন।
  • স্বাধীনতার ঘোষণা: তিনি ব্রিটিশ কোম্পানির শাসনের অবসান ঘোষণা করে নিজেকে স্বাধীন রাজা বলে দাবি করেন এবং চব্বিশ পরগনা, নদীয়া ও ফরিদপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজের আধিপত্য কায়েম করেন।

পরিণতি: তিতুমিরের এই স্পর্ধায় শঙ্কিত হয়ে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক 1831 খ্রিস্টাব্দে কামানসহ এক বিশাল ব্রিটিশ সেনাদল পাঠান। কামানের গোলার আঘাতে বাঁশের কেল্লা ধ্বংস হয়ে যায়। তিতুমির তাঁর বহু অনুগামীসহ বীরের মতো যুদ্ধ করে শহিদ হন এবং এই বিদ্রোহের অবসান ঘটে।

7. মুন্ডা বিদ্রোহ বা ‘উলগুলান’ (1899-1900) কবে, কার নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল? এই বিদ্রোহের প্রধান কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
ভূমিকা: 1899-1900 খ্রিস্টাব্দে ছোটোনাগপুরের রাঁচি অঞ্চলে বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে মুন্ডা আদিবাসীরা যে প্রবল গণবিদ্রোহ গড়ে তুলেছিল, তা মুন্ডা বিদ্রোহ বা ‘উলগুলান’ (ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা) নামে পরিচিত।

বিদ্রোহের প্রধান কারণসমূহ:

  • খুঁৎকাঠি প্রথা বাতিল: মুন্ডাদের চিরাচরিত সমাজ ব্যবস্থায় জমির যৌথ মালিকানা বা ‘খুঁৎকাঠি’ প্রথা প্রচলিত ছিল। ব্রিটিশরা তা বাতিল করে ব্যক্তিগত মালিকানা এবং চড়া ভূমিরাজস্ব চাপিয়ে দেয়।
  • দিকুদের শোষণ: বহিরাগত জমিদার, মহাজন ও ঠিকাদারদের (দিকু) শোষণে মুন্ডারা তাদের নিজেদের জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয় এবং দিনমজুর বা বেগার খাটতে বাধ্য হয়।
  • মিশনারিদের ভূমিকা: খ্রিস্টান মিশনারিরা মুন্ডাদের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরিত করছিল, যা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ধর্ম ও রীতিনীতিতে গভীর আঘাত হেনেছিল।
  • বিরসা মুন্ডার নেতৃত্ব: বিরসা মুন্ডা নিজেকে ‘ভগবানের দূত’ (ধরিত্রী আবা) বলে ঘোষণা করেন। তিনি মুন্ডাদের সমস্ত দিকু, মিশনারি ও ব্রিটিশদের বিতাড়িত করে একটি স্বাধীন ‘মুন্ডা রাজ’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখান, যা সাধারণ মুন্ডাদের প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করে।

ফলাফল:

  • ব্রিটিশ সেনাবাহিনী আধুনিক অস্ত্রের সাহায্যে এই বিদ্রোহ নিষ্ঠুরভাবে দমন করে। 1900 সালে রাঁচি জেলে কলেরায় বিরসা মুন্ডার মৃত্যু হলে বিদ্রোহ থেমে যায়।
  • বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও ব্রিটিশ সরকার 1908 সালে ‘ছোটোনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন’ পাস করে। এর ফলে মুন্ডাদের ‘খুঁৎকাঠি’ প্রথা বা জমির যৌথ অধিকার আবার আইনি স্বীকৃতি পায় এবং বেগার শ্রম বেআইনি ঘোষিত হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার