অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 7 ‘ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন’ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3
অধ্যায় 7: জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন
(বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 3) – পর্ব 1
নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:
1. লর্ড কার্জন কী উদ্দেশ্যে বঙ্গভঙ্গ (1905) করেছিলেন?
উত্তর দেখো
- প্রকাশ্য উদ্দেশ্য (প্রশাসনিক সুবিধা): কার্জনের দাবি ছিল, বাংলা প্রেসিডেন্সি আয়তনে বিশাল এবং এর জনসংখ্যা প্রায় 7 কোটি 80 লক্ষ। তাই একজন গভর্নরের পক্ষে এত বড় প্রদেশ সুষ্ঠুভাবে শাসন করা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক সুবিধার জন্যই বাংলাকে ভাগ করা হচ্ছে।
- প্রকৃত বা গোপন উদ্দেশ্য (রাজনৈতিক): এর আসল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করা। 20 শতকের শুরুতে বাংলা ছিল ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান প্রাণকেন্দ্র। হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং বাঙালি জাতিকে খণ্ডিত করে এই আন্দোলনকে ধ্বংস করাই ছিল কার্জনের মূল লক্ষ্য।
2. ‘বয়কট’ ও ‘স্বদেশি’ আন্দোলন একে অপরের পরিপূরক ছিল কেন?
উত্তর দেখো
- বয়কট: এর অর্থ হলো ব্রিটিশদের তৈরি সমস্ত বিদেশি দ্রব্য (বিশেষ করে কাপড় ও লবণ), শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি উপাধি বর্জন করা, যাতে ব্রিটিশরা আর্থিকভাবে দুর্বল হয়।
- স্বদেশি: বিদেশি দ্রব্য বর্জন করলে মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব দেখা দেবে। সেই অভাব মেটানোর জন্য দেশীয় উদ্যোগে নিজস্ব কলকারখানা তৈরি করে দেশি জিনিসপত্র উৎপাদন ও ব্যবহার করার নীতিই হলো স্বদেশি।
- পরিপূরক: বিদেশি দ্রব্য বর্জন (বয়কট) না করলে দেশীয় শিল্পের (স্বদেশি) বিকাশ ঘটানো সম্ভব ছিল না। আবার, স্বদেশি জিনিসপত্র তৈরি না হলে বয়কট আন্দোলনও টিকিয়ে রাখা যেত না। তাই এরা ছিল মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
3. বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে বাংলার নারী সমাজের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর দেখো
- বয়কট কর্মসূচিতে যোগদান: তাঁরা বিদেশি রেশমি চুড়ি, বিদেশি কাপড় ও বিলিতি লবণ ব্যবহার করা ছেড়ে দেন এবং মাটির হাঁড়িতে দেশি লবণ তৈরি করতে শুরু করেন।
- রাখিবন্ধন ও অরন্ধন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে 1905 সালের 16 অক্টোবর হিন্দু-মুসলিম মিলনের প্রতীক হিসেবে তাঁরা রাখিবন্ধন উৎসবে যোগ দেন এবং রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর ডাকে ঘরে ঘরে রান্না বন্ধ রেখে ‘অরন্ধন’ পালন করেন।
- অর্থ সংগ্রহ: স্বদেশি আন্দোলনের খরচ চালানোর জন্য বহু নারী নিজেদের জমানো টাকা এবং সোনার গয়না অকাতরে দেশের কাজে দান করেছিলেন।
4. জাতীয় কংগ্রেসে ‘চরমপন্থী’ (Extremists) জাতীয়তাবাদের উত্থানের কারণগুলি কী ছিল?
উত্তর দেখো
- নরমপন্থীদের ব্যর্থতা: প্রথম 20 বছর নরমপন্থী নেতাদের নিয়মতান্ত্রিক ‘আবেদন-নিবেদন’ নীতি ব্রিটিশদের কাছ থেকে কোনো বড় রাজনৈতিক অধিকার আদায় করতে ব্যর্থ হয়। এতে তরুণ নেতারা হতাশ হয়ে পড়েন।
- ব্রিটিশদের দমননীতি: লর্ড কার্জনের দমনমূলক শাসন, বৈষম্যমূলক নীতি এবং সর্বোপরি বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ভারতীয়দের চরম ক্ষুব্ধ করে তোলে।
- আন্তর্জাতিক প্রভাব: 1896 সালে ইথিওপিয়ার মতো ক্ষুদ্র দেশের কাছে ইতালির পরাজয় এবং 1905 সালে জাপানের কাছে বিশাল রাশিয়ার পরাজয় ভারতীয়দের মনে এই আত্মবিশ্বাস জাগায় যে, ঐক্যবদ্ধ হলে শক্তিশালী ইউরোপীয়দেরও হারানো সম্ভব।
5. 1907 সালের ‘সুরাট বিচ্ছেদ’ (Surat Split)-এর কারণ ও গুরুত্ব আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
গুরুত্ব: এই প্রবল মতবিরোধের জেরে জাতীয় কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি দলে (নরমপন্থী ও চরমপন্থী) ভেঙে যায়। চরমপন্থীদের কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত করা হয়। এর ফলে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সাময়িকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং ব্রিটিশ সরকার সহজে চরমপন্থীদের দমন করার সুযোগ পেয়েছিল।
6. বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে ‘অনুশীলন সমিতি’ ও ‘যুগান্তর দল’-এর ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর দেখো
- অনুশীলন সমিতি: 1902 সালে প্রমথনাথ মিত্র এটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে লাঠিখেলা ও শরীরচর্চার আড়ালে এরা গোপনে বোমা তৈরি ও ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি নিত। পুলিনবিহারী দাসের নেতৃত্বে ঢাকা অনুশীলন সমিতি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
- যুগান্তর দল: অরবিন্দ ঘোষ এবং বারীন্দ্রকুমার ঘোষের নেতৃত্বে অনুশীলন সমিতির একটি চরমপন্থী অংশ ‘যুগান্তর’ পত্রিকা প্রকাশ করে এবং যুগান্তর দল গঠন করে। এই দলের বিপ্লবীরাই (যেমন ক্ষুদিরাম বসু) ব্রিটিশ অত্যাচারী অফিসারদের হত্যা করার দুঃসাহসিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতেন।
7. ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঘা যতীন (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) কেন স্মরণীয়?
উত্তর দেখো
- সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে তিনি জার্মান অস্ত্রশস্ত্র ও অর্থের সাহায্যে ভারতের ভেতরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর সশস্ত্র সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন।
- বুড়িবালামের যুদ্ধ: তাঁর পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেলে 1915 সালের 9 সেপ্টেম্বর ওড়িশার বালেশ্বরে বুড়িবালাম নদীর তীরে চার্লস টেগার্টের বিশাল ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে তিনি মাত্র চারজন সঙ্গী নিয়ে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হন। বাঘের মতো বীর বিক্রমে লড়াই করে তিনি শহিদ হন, যা আজও ভারতবাসীকে প্রবলভাবে অনুপ্রেরণা জোগায়।
8. ‘গদর পার্টি’ কবে, কোথায় এবং কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
উত্তর দেখো
- প্রতিষ্ঠা: 1913 খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরে লালা হরদয়াল, তারকনাথ দাস, সোহন সিং ভাকনা প্রমুখ প্রবাসী ভারতীয়রা ‘গদর পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন। ‘গদর’ কথার অর্থ হলো বিপ্লব।
- উদ্দেশ্য: এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের বাইরে থেকে অস্ত্রশস্ত্র, অর্থ এবং প্রবাসী ভারতীয়দের সাহায্য নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বিপ্লব গড়ে তোলা। তারা ‘গদর’ নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করত, যেখানে ব্রিটিশদের অত্যাচারের কথা তুলে ধরা হতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা ভারতে এসে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করলেও, ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়ে তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
9. ‘রাওলাট আইন’ (1919) কেন প্রবর্তন করা হয়েছিল? এই আইনের প্রধান শর্তগুলি কী ছিল?
উত্তর দেখো
শর্ত: এই কালাকানুনে বলা হয়— (1) পুলিশ বিনা ওয়ারেন্টে বা বিনা প্রমাণে যে কোনো সন্দেহভাজন ভারতীয়কে গ্রেপ্তার করতে পারবে। (2) বিনা বিচারে কোনো ব্যক্তিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য জেলে আটকে রাখা যাবে এবং এর বিরুদ্ধে কোনো আইনি আপিল করা যাবে না।
10. জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের (1919) কারণ ও ফলাফল সংক্ষেপে আলোচনা করো。
উত্তর দেখো
হত্যাকাণ্ড ও ফলাফল: ব্রিটিশ জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার সেই মাঠের একমাত্র নির্গমন পথটি আটকে দিয়ে নিরস্ত্র জনতার ওপর 10 মিনিট ধরে একটানা গুলিবর্ষণ করেন। এতে হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এই বর্বরোচিত ঘটনার প্রতিবাদে সারা দেশে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশদের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করেন। এই ঘটনা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে এক নতুন পথে পরিচালিত করেছিল।
11. খিলাফত আন্দোলন কেন শুরু হয়েছিল? ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এর গুরুত্ব কী?
উত্তর দেখো
গুরুত্ব: মহাত্মা গান্ধী এই আন্দোলনকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক সুবর্ণ সুযোগ বলে মনে করেন। তিনি খিলাফত আন্দোলনকে কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনের সাথে যুক্ত করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক বিশাল সর্বভারতীয় গণআন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
12. মহাত্মা গান্ধীর ‘সত্যাগ্রহ’ (Satyagraha) আদর্শের মূল নীতিগুলি কী ছিল?
উত্তর দেখো
- অহিংসা: সত্যাগ্রহের প্রথম শর্ত হলো সম্পূর্ণ অহিংসা। কোনো অবস্থাতেই প্রতিপক্ষের প্রতি শারীরিক বা মানসিক হিংসা প্রয়োগ করা যাবে না।
- সত্যের প্রতি অবিচল বিশ্বাস: সত্যাগ্রহী সব সময় সত্যের পথে চলবেন এবং চরম অত্যাচার সহ্য করেও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবেন না।
- শত্রুর হৃদয় পরিবর্তন: সত্যাগ্রহীর লক্ষ্য শত্রুকে ধ্বংস করা নয়, বরং নিজের অসীম ধৈর্য ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে শত্রুর মনে অনুশোচনা জাগিয়ে তার হৃদয় পরিবর্তন করা।
13. 1922 খ্রিস্টাব্দে গান্ধীজি কেন অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন?
উত্তর দেখো
- ঘটনা: 1922 সালের 4 ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা গ্রামে একটি শান্তিপূর্ন মিছিলে পুলিশ বিনা প্ররোচনায় গুলি চালায়। এর ফলে উত্তেজিত জনতা স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং 22 জন পুলিশকর্মী জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান।
- গান্ধীজির প্রতিক্রিয়া: গান্ধীজি ছিলেন সম্পূর্ণ অহিংসার পূজারি। তিনি বুঝতে পারেন যে, সাধারণ মানুষ এখনও অহিংস সত্যাগ্রহের অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। তাই এত বড় একটি হিংসাত্মক ঘটনার পর অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে তিনি 1922 সালের 12 ফেব্রুয়ারি এই গণআন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
14. ‘স্বরাজ্য দল’ (1923) কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? এর মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
- প্রেক্ষাপট: গান্ধীজি হঠাৎ করে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করলে চিত্তরঞ্জন দাশ এবং মতিলাল নেহরুর মতো নেতারা প্রবল হতাশ হন। তাঁরা মনে করেন যে ব্রিটিশদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা থামিয়ে রাখা উচিত নয়।
- উদ্দেশ্য: তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে, কংগ্রেসের বাইরে থেকে বয়কটের বদলে নির্বাচনে জিতে আইনসভায় (কাউন্সিলে) প্রবেশ করতে হবে। এরপর ভেতর থেকে ব্রিটিশ সরকারের সমস্ত অন্যায় আইন ও বাজেটের তীব্র বিরোধিতা করে শাসনব্যবস্থাকে অচল করে দিতে হবে। এই উদ্দেশ্যেই 1923 সালের 1 জানুয়ারি তাঁরা ‘স্বরাজ্য দল’ প্রতিষ্ঠা করেন।
15. ‘সাইমন কমিশন’ (1928) কেন ভারতে এসেছিল এবং ভারতীয়রা কেন একে বয়কট করেছিল?
উত্তর দেখো
বয়কটের কারণ: ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য তৈরি এই কমিশনে মোট 7 জন সদস্য ছিলেন, কিন্তু তার মধ্যে একজনও ভারতীয় ছিলেন না। ভারতীয়দের নিজেদের ভবিষ্যৎ স্থির করার অধিকার না দেওয়ায়, জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ একে চরম অপমানজনক মনে করে এবং কালো পতাকা দেখিয়ে “গো ব্যাক সাইমন” স্লোগান দিয়ে এই কমিশনকে সম্পূর্ণ বয়কট করে।
16. 1929 সালের জাতীয় কংগ্রেসের ‘লাহোর অধিবেশন’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?
উত্তর দেখো
- পূর্ণ স্বরাজ দাবি: এই অধিবেশনে জাতীয় কংগ্রেস প্রথমবারের জন্য স্বায়ত্তশাসনের বদলে ভারতের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে ‘পূর্ণ স্বরাজ’ বা সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে।
- স্বাধীনতা দিবস পালন: এই অধিবেশনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, 1930 সালের 26 জানুয়ারি সারা দেশে প্রথম স্বাধীনতা দিবস পালিত হবে। ওইদিন ভারতবাসী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীনতার শপথ গ্রহণ করেছিল।
17. ‘ডান্ডি অভিযান’ (1930) কী? এর তাৎপর্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
তাৎপর্য: লবণ আইন ভঙ্গের এই ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমেই ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ‘আইন অমান্য আন্দোলন’ শুরু হয়েছিল, যা সারা দেশের সাধারণ মানুষকে এক ছাতার তলায় এনেছিল।
18. ‘খোদাই খিদমতগার’ বা লালকোর্তা বাহিনীর ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর দেখো
- দল গঠন: তিনি সাধারণ মানুষকে নিয়ে ‘খোদাই খিদমতগার’ (ঈশ্বরের সেবক) নামে একটি অহিংস স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন। সদস্যরা লাল রঙের কুর্তা পরতেন বলে এদের লালকোর্তা বাহিনীও বলা হতো।
- ভূমিকা: এই বাহিনী অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অহিংস পথে আইন অমান্য আন্দোলন চালিয়েছিল। ব্রিটিশ পুলিশ এদের ওপর চরম দমননীতি ও গুলি চালালেও এরা গান্ধীজির অহিংসার আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেনি।
19. মাস্টারদা সূর্য সেনের ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ (1930) সম্পর্কে কী জানো?
উত্তর দেখো
- পরিকল্পনা: মাস্টারদা সূর্য সেন তাঁর ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’ বা ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’ (IRA)-র তরুণ বিপ্লবীদের (অনন্ত সিং, লোকনাথ বল, কল্পনা দত্ত প্রমুখ) নিয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ লাইন এবং অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগার দখল করার এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনা করেন।
- লুণ্ঠন ও স্বাধীনতা: 1930 সালের 18 এপ্রিল তাঁরা সফলভাবে অস্ত্রাগার দখল করেন এবং শহরের টেলিফোন, টেলিগ্রাফ লাইন ও রেলপথ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেন। 19 এপ্রিল সূর্য সেন সেখানে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে অস্থায়ী স্বাধীন সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করেছিলেন।
20. ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ (1930) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
- প্রেক্ষাপট: তৎকালীন কারা-পরিদর্শক কর্নেল সিম্পসন জেলে রাজবন্দিদের ওপর অমানুষিক শারীরিক অত্যাচার করতেন। ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’-এর তিন তরুণ বিপ্লবী বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্ত এর প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
- যুদ্ধ: 1930 সালের 8 ডিসেম্বর তাঁরা ইউরোপীয় পোশাকে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করে সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। এরপর রাইটার্সের বারান্দায় বা অলিন্দে চার্লস টেগার্টের নেতৃত্বে আসা বিশাল ব্রিটিশ পুলিশের সাথে তাঁদের যে ভয়ংকর সশস্ত্র লড়াই হয়, তা ভারতের ইতিহাসে ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ নামে বিখ্যাত।
21. 1942 সালের ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ (Quit India Movement) শুরু হওয়ার প্রধান কারণগুলি কী ছিল?
উত্তর দেখো
- ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা: 1942 সালে ব্রিটিশ সরকার ‘ক্রিপস মিশন’ ভারতে পাঠায়, কিন্তু তারা ভারতের স্বাধীনতার কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি না দেওয়ায় ভারতীয়রা চরম ক্ষুব্ধ হয়।
- জাপানি আক্রমণের ভয়: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের পরাজিত করে জাপানি সেনাবাহিনী ভারতের দোরগোড়ায় (রেঙ্গুন) পৌঁছে গিয়েছিল। গান্ধীজি বুঝতে পারেন ব্রিটিশরা ভারতে থাকলে ভারতও আক্রান্ত হবে।
- অর্থনৈতিক সংকট: যুদ্ধের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে দেশকে রক্ষা করার জন্য 1942 সালের আগস্ট মাসে গান্ধীজি ব্রিটিশদের অবিলম্বে ভারত ছেড়ে যাওয়ার ডাক দেন।
22. ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এর সময় মেদিনীপুরের তমলুকে গঠিত ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ সম্পর্কে কী জানো?
উত্তর দেখো
- জাতীয় সরকার গঠন: 1942 সালের 17 ডিসেম্বর দেশপ্রাণ সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে তমলুকে ব্রিটিশ প্রশাসনকে সম্পূর্ণ উৎখাত করে একটি স্বাধীন ও সমান্তরাল ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ গঠিত হয়।
- কার্যাবলি: এই সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রায় দু-বছর নিজেদের প্রশাসন চালিয়েছিল। এদের নিজস্ব পুলিশ বাহিনী (‘বিদ্যুৎ বাহিনী’), নিজস্ব বিচারব্যবস্থা এবং ত্রাণবণ্টন ব্যবস্থা ছিল, যা ব্রিটিশ সরকারের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।
23. সুভাষচন্দ্র বসু কেন জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করে ‘ফরোয়ার্ড ব্লক’ (1939) গঠন করেছিলেন?
উত্তর দেখো
- মতবিরোধ: 1939 সালের ত্রিপুরি কংগ্রেস অধিবেশনে গান্ধীজি মনোনীত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে হারিয়ে সুভাষচন্দ্র বসু দ্বিতীয়বারের জন্য সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের ব্রিটিশ বিরোধী চরমপন্থী আদর্শের সাথে গান্ধীজির অহিংস নীতির ঘোরতর বিরোধ দেখা দেয়।
- পদত্যাগ ও নতুন দল: কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির অসহযোগিতায় তিনি কাজ করতে না পেরে 1939 সালে সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর দেশের বামপন্থী, সমাজতন্ত্রী ও প্রগতিশীল যুবকদের একত্রিত করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে তিনি কংগ্রেসের ভেতরেই ‘ফরোয়ার্ড ব্লক’ দল গঠন করেন।
24. নৌ-বিদ্রোহ (1946) কেন শুরু হয়েছিল? ভারতের স্বাধীনতায় এর গুরুত্ব কী?
উত্তর দেখো
গুরুত্ব: এই বিদ্রোহ দ্রুত করাচি, মাদ্রাজ এবং কলকাতার বন্দরগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। নৌ-বিদ্রোহ ব্রিটিশদের কাছে প্রমাণ করে দেয় যে, যাদের ওপর ভরসা করে তারা ভারতে শাসন করছে, সেই সেনাবাহিনীও আর ব্রিটিশদের অনুগত নয়। এর ফলেই ব্রিটিশরা বুঝতে পারে ভারতে তাদের দিন শেষ হয়ে এসেছে।