অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – ৪: ‘সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ’ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3

অধ্যায় 8: সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ
(বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 3)

নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

1. ব্রিটিশ সরকার কেন এবং কীভাবে ভারতে ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ (Divide and Rule) নীতি প্রয়োগ করেছিল?

উত্তর দেখো
  • কারণ: 1857 সালের মহাবিদ্রোহে হিন্দু ও মুসলিমদের অসাধারণ ঐক্য দেখে ব্রিটিশরা ভয় পেয়েছিল। তারা বুঝতে পারে, এই দুই সম্প্রদায় এক থাকলে ভারতে ব্রিটিশ শাসন টিকবে না।
  • প্রয়োগ: তাই তারা সুকৌশলে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টির চেষ্টা করে। তারা কখনো হিন্দুদের আবার কখনো মুসলিমদের বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে।
  • ফলাফল: এই নীতির চরম পরিণতি ছিল 1909 সালের আইনে মুসলিমদের জন্য ‘পৃথক নির্বাচন’-এর অধিকার দান, যা ভারতের বুকে সাম্প্রদায়িকতার বীজ স্থায়ীভাবে রোপণ করেছিল।

2. স্যার সৈয়দ আহমেদ খান কেন ‘আলিগড় আন্দোলন’ শুরু করেছিলেন?

উত্তর দেখো
স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের আলিগড় আন্দোলন শুরুর প্রধান কারণগুলি ছিল:

  • শিক্ষার প্রসার: 19 শতকে হিন্দুরা ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করে অনেক এগিয়ে গেলেও মুসলিম সমাজ আধুনিক শিক্ষা থেকে পিছিয়ে ছিল। মুসলিমদের মধ্যে আধুনিক বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটানোই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
  • ব্রিটিশদের আনুকূল্য লাভ: তিনি বিশ্বাস করতেন যে একমাত্র ব্রিটিশদের সাহায্যেই মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক উন্নতি সম্ভব। তাই মুসলিমদের ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব দূর করে ব্রিটিশদের অনুগত করে তোলা তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।

3. স্যার সৈয়দ আহমেদ খান কেন জাতীয় কংগ্রেসের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন?

উত্তর দেখো
  • হিন্দু আধিপত্যের ভয়: তিনি মনে করতেন জাতীয় কংগ্রেস হলো মূলত হিন্দুদের একটি রাজনৈতিক সংগঠন। কংগ্রেসে যোগ দিলে ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে।
  • ব্রিটিশদের বিরাগভাজন হওয়া: সৈয়দ আহমেদ মুসলিমদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, কংগ্রেসে যোগ দিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করলে মুসলিমরা ব্রিটিশদের আনুকূল্য ও চাকরি থেকে বঞ্চিত হবে। এই কারণেই তিনি 1888 সালে কংগ্রেস বিরোধী একটি সংগঠনও তৈরি করেছিলেন।

4. ভারতে সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধিতে থিওডোর বেক (Theodore Beck)-এর ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর দেখো
আলিগড় মহমেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজের প্রথম ব্রিটিশ অধ্যক্ষ থিওডোর বেক ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে ফাটল ধরানোর প্রধান কারিগর ছিলেন:

  • তিনি স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের মনে গভীরভাবে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেন যে, কংগ্রেসের হিন্দু নেতারা মুসলিমদের ক্ষতি করতে চায়।
  • তিনি আলিগড়ের ছাত্রদের রাজনীতি ও কংগ্রেস থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেন এবং তাদের মনে তীব্র হিন্দু বিরোধী ও ব্রিটিশদের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের মনোভাব জাগিয়ে তোলেন।

5. 1906 খ্রিস্টাব্দে ‘মুসলিম লিগ’ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যগুলি কী ছিল?

উত্তর দেখো
1906 সালে নবাব সলিমুল্লাহ ও আগা খানের নেতৃত্বে মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্যগুলি ছিল:

  • ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতের মুসলিমদের রাজনৈতিক আনুগত্য বৃদ্ধি করা।
  • ভারতের মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক, আইনি ও অর্থনৈতিক অধিকারগুলি রক্ষা করা এবং সরকারের কাছে তাদের দাবিগুলি পেশ করা।
  • মুসলিমদের মধ্যে যেন কোনোভাবেই ব্রিটিশ বিরোধী বা জাতীয়তাবাদী মনোভাব তৈরি না হয়, সেদিকে নজর রাখা।

6. 1909 সালের ‘মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন’-এর সাম্প্রদায়িক গুরুত্ব আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
  • পৃথক নির্বাচন: এই আইনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি ছিল মুসলিমদের জন্য ‘পৃথক নির্বাচন’ (Separate Electorate) ব্যবস্থার প্রবর্তন। অর্থাৎ, মুসলিম প্রার্থীরা কেবল মুসলিম ভোটারদের ভোটেই নির্বাচিত হবেন।
  • গুরুত্ব ও বিভেদ: এই আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশরা সুকৌশলে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভেদকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছিল। এর ফলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব এতটাই বেড়ে যায় যা শেষ পর্যন্ত দেশভাগের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

7. ‘হিন্দু মহাসভা’ (1915) কেন গঠিত হয়েছিল? এর মূল লক্ষ্য কী ছিল?

উত্তর দেখো
  • প্রেক্ষাপট: 1906 সালে মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠা এবং 1909 সালে ব্রিটিশদের মুসলিম তোষণ নীতির কারণে হিন্দুদের একাংশ নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত হয়ে পড়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় পণ্ডিত মদনমোহন মালব্যের উদ্যোগে 1915 সালে হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • লক্ষ্য: এর মূল লক্ষ্য ছিল সারা ভারতের হিন্দুদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করা, হিন্দু সংস্কৃতির রক্ষা করা এবং মুসলিম লিগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মোকাবিলা করে হিন্দুদের অধিকার সুনিশ্চিত করা।

8. 1920-এর দশকে ‘শুদ্ধি’ ও ‘সংগঠন’ আন্দোলনের প্রভাব কী হয়েছিল?

উত্তর দেখো
  • আন্দোলনের স্বরূপ: আর্য সমাজ 1920-এর দশকে ধর্মান্তরিত হিন্দুদের পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য ‘শুদ্ধি’ আন্দোলন এবং হিন্দুদের রাজনৈতিকভাবে একজোট করতে ‘সংগঠন’ আন্দোলন শুরু করে।
  • প্রভাব: এই আন্দোলনের ফলে মুসলিম সমাজ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং তারা পালটা ‘তবলিগ’ (ইসলাম প্রচার) ও ‘তানজিম’ আন্দোলন শুরু করে। এর ফলে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং উত্তর ভারতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেধে যায়।

9. মহম্মদ আলি জিন্নাহর ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ (Two-Nation Theory) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর দেখো
মহম্মদ আলি জিন্নাহর প্রচারিত এই তত্ত্বই হলো দেশভাগের মূল আদর্শগত ভিত্তি:

  • মূল কথা: জিন্নাহ দাবি করেন যে, ভারতের হিন্দু এবং মুসলিমরা কেবল দুটি পৃথক ধর্মাবলম্বী গোষ্ঠী নয়। তাদের ধর্ম, জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সামাজিক নিয়মকানুন সম্পূর্ণ আলাদা। তাই তারা হলো দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র ‘জাতি’ (Nation)।
  • সিদ্ধান্ত: দুটি পৃথক জাতির রাজনৈতিক লক্ষ্য কখনোই এক হতে পারে না। তাই একটি স্বাধীন ও অখণ্ড রাষ্ট্রে এই দুই জাতির একসঙ্গে বসবাস করা সম্পূর্ণ অসম্ভব।

10. ‘পাকিস্তান’ শব্দটির উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল?

উত্তর দেখো
  • প্রথম ব্যবহার: 1933 খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুসলিম ছাত্র চৌধুরী রহমত আলি তাঁর ‘Now or Never’ নামক একটি পুস্তিকায় প্রথম ‘পাকিস্তান’ (Pakistan) শব্দটি ব্যবহার করেন।
  • গঠন: ভারতের উত্তর-পশ্চিমের মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশগুলির ইংরেজি নামের আদ্যক্ষর নিয়ে তিনি এই শব্দটি তৈরি করেছিলেন। P (Punjab), A (Afghan/NWFP), K (Kashmir), S (Sind) এবং TAN (Baluchistan)—এগুলি জুড়েই ‘PAKISTAN’ বা পাকিস্তান নামটির জন্ম।

11. 1940 সালের ‘লাহোর প্রস্তাব’-এর মূল বক্তব্য ও গুরুত্ব কী ছিল?

উত্তর দেখো
  • মূল বক্তব্য: 1940 সালে মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে ফজলুল হক একটি প্রস্তাব পেশ করেন। এতে বলা হয়, ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের (যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ) ভৌগোলিক সীমানা পরিবর্তন করে মুসলিমদের জন্য স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করতে হবে।
  • গুরুত্ব: এই প্রস্তাবে সরাসরি ‘পাকিস্তান’ শব্দটির উল্লেখ না থাকলেও, এটিই ছিল মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রথম আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দাবি, যা পরবর্তীকালে দেশভাগকে অনিবার্য করে তোলে।

12. 1946 সালের ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ (Direct Action Day)-এর কারণ ও ফলাফল কী ছিল?

উত্তর দেখো
  • কারণ: 1946 সালে ক্যাবিনেট মিশন ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা পেশ করলে জিন্নাহ অনুভব করেন যে এতে স্বাধীন পাকিস্তানের দাবি সরাসরি মেনে নেওয়া হয়নি। তাই পাকিস্তান রাষ্ট্র আদায়ের জন্য বলপ্রয়োগের রাস্তা বেছে নিয়ে তিনি 16 আগস্ট ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’-এর ডাক দেন।
  • ফলাফল: এর ফলে 16 আগস্ট কলকাতা শহরে এক চরম ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও গণহত্যা শুরু হয়, যা ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে পরিচিত। এই দাঙ্গার আগুন দ্রুত নোয়াখালি, বিহার ও পাঞ্জাবে ছড়িয়ে পড়ে।

13. ‘ক্যাবিনেট মিশন’ বা মন্ত্রী মিশন (1946) কেন ভারতে এসেছিল এবং তাদের প্রস্তাব কী ছিল?

উত্তর দেখো
  • আসার কারণ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের ক্ষমতা কীভাবে ভারতীয়দের হাতে তুলে দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা করতে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার তিনজন সদস্য ভারতে আসেন।
  • প্রস্তাব: তারা ভারতকে ভাগ না করে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রস্তাব দেয়। এতে বলা হয়, দেশীয় রাজ্য ও ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশগুলিকে নিয়ে একটি অখণ্ড ভারত গঠিত হবে এবং স্বাধীন ভারতের জন্য একটি ‘গণপরিষদ’ গঠন করে সংবিধান রচনা করা হবে। কিন্তু কংগ্রেস ও লিগের মধ্যে মতবিরোধের জেরে এই প্রস্তাব ব্যর্থ হয়।

14. ‘মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা’ (1947) কী? এর মূল সিদ্ধান্ত কী ছিল?

উত্তর দেখো
1947 সালের 3 জুন ভারতের শেষ ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর জন্য যে চূড়ান্ত রূপরেখা পেশ করেন, তা মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা নামে পরিচিত।

  • মূল সিদ্ধান্ত: এতে বলা হয়, ভারতবর্ষকে খণ্ডিত করে ‘ভারত’ ও ‘পাকিস্তান’ নামে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা হবে।
  • পাঞ্জাব ও বাংলা প্রদেশ দুটিকে ধর্মের ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে এবং দেশীয় রাজ্যগুলি নিজেদের ইচ্ছেমতো যেকোনো রাষ্ট্রে যোগ দিতে পারবে।

15. ‘র‍্যাডক্লিফ লাইন’ কী? এটি কীভাবে নির্ধারিত হয়েছিল?

উত্তর দেখো
  • র‍্যাডক্লিফ লাইন: 1947 সালের দেশভাগের সময় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ করার জন্য ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ যে বিভাজন রেখা তৈরি করেছিলেন, তা-ই র‍্যাডক্লিফ লাইন।
  • কীভাবে নির্ধারিত হয়: বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশের কোন কোন অঞ্চলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং কোন অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ—তার ওপর ভিত্তি করে মানচিত্রের ওপর পেনসিল দিয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অবৈজ্ঞানিকভাবে এই লাইন টানা হয়েছিল, যা কোটি কোটি মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছিল।

16. 1947 সালে ‘স্বাধীন ও অখণ্ড বাংলা’ গঠনের প্রস্তাব কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

উত্তর দেখো
দেশভাগের সময় শরৎচন্দ্র বসু এবং হোসেন শাহিদ সুহরাবর্দি বাংলাকে ভাগ না করে একটি স্বাধীন ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ গড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু এটি ব্যর্থ হয় কারণ:

  • হিন্দু মহাসভার বিরোধিতা: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভা আশঙ্কা করেছিল যে অখণ্ড বাংলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হবে, তাই তারা বাংলা ভাগের দাবি তোলে।
  • কংগ্রেস ও লিগের অমত: জাতীয় কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব (নেহরু ও প্যাটেল) এবং মুসলিম লিগের নেতা জিন্নাহ কেউই এই প্রস্তাব সমর্থন করেননি। ফলে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়।

17. ভারতের দেশভাগের ফলে সৃষ্ট ‘উদ্বাস্তু সমস্যা’ (Refugee Crisis) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর দেখো
  • 1947 সালে দেশভাগের পর ভারত এবং নবগঠিত পাকিস্তানে চরম হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়।
  • প্রাণ বাঁচাতে লক্ষ লক্ষ হিন্দু ও শিখ পরিবার পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান থেকে নিজেদের ভিটেমাটি, জমি ও সম্পত্তি ফেলে একবস্ত্রে ভারতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। একইভাবে ভারত থেকেও বহু মুসলিম পাকিস্তানে চলে যায়।
  • পরিচয়হীন, সম্বলহীন এই ছিন্নমূল মানুষদের অন্ন, বস্ত্র ও মাথা গোঁজার ঠাঁই দেওয়ার যে বিশাল সংকট তৈরি হয়েছিল, স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে তা-ই ‘উদ্বাস্তু সমস্যা’ নামে পরিচিত।

18. পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আসা উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য ভারত সরকার কী কী ব্যবস্থা নিয়েছিল?

উত্তর দেখো
পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা লক্ষ লক্ষ মানুষের পুনর্বাসন ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ:

  • রিলিফ ক্যাম্প: প্রথমে সরকার শিয়ালদহ স্টেশন এবং বিভিন্ন জায়গায় রিলিফ ক্যাম্প খুলে তাদের সাময়িক আশ্রয় ও খাদ্যের ব্যবস্থা করে।
  • জমি ও ঋণ প্রদান: কিছু পরিবারকে বাড়ি তৈরির জন্য জমি এবং ছোটখাটো ব্যবসা বা কৃষিকাজের জন্য ঋণ দেওয়া হয়। অনেক উদ্বাস্তু নিজেদের উদ্যোগেই জবরদখল করে কলোনি তৈরি করে নেন (যেমন- যাদবপুর, বিজয়গড়)।
  • দণ্ডকারণ্য প্রকল্প: পশ্চিমবঙ্গে জায়গার অভাব দেখা দিলে সরকার বহু উদ্বাস্তুকে জোর করে মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা (দণ্ডকারণ্য) এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে পাঠিয়ে সেখানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছিল, যা ছিল অত্যন্ত অমানবিক।

19. জাতীয় কংগ্রেস কেন শেষ পর্যন্ত ভারত ভাগের প্রস্তাব (মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা) মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল?

উত্তর দেখো
জাতীয় কংগ্রেস আজীবন অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন দেখলেও কয়েকটি কারণে তারা দেশভাগ মেনে নেয়:

  • সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা: 1946 সালের ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’-এর পর সারা দেশে যে ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ও রক্তপাত শুরু হয়, তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার আর কোনো উপায় ছিল না।
  • শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে মুসলিম লিগ যোগ দিলেও তারা পদে পদে কংগ্রেসকে বাধা দিচ্ছিল, ফলে দেশের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।
  • গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা: জওহরলাল নেহরু ও প্যাটেল বুঝতে পারেন যে, জোর করে মুসলিমদের ধরে রাখলে সারা দেশে এক অন্তহীন গৃহযুদ্ধ শুরু হবে। তাই একটি দুর্বল ও খণ্ডিত ভারত হলেও তা শান্তিপূর্ন হোক, এই ভেবেই তাঁরা দেশভাগ মেনে নেন।

20. স্বাধীন ভারতে ‘দেশীয় রাজ্যগুলির’ (Princely States) অন্তর্ভুক্তিতে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর দেখো
স্বাধীনতার সময় ভারতে 500-র বেশি দেশীয় রাজ্য ছিল, যাদের ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার অথবা স্বাধীন থাকার অধিকার দেওয়া হয়েছিল।

  • কূটনৈতিক ও কঠোর নীতি: স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল তাঁর অসামান্য কূটনৈতিক বুদ্ধি এবং কঠোর নীতি প্রয়োগ করে বেশিরভাগ রাজাকে বুঝিয়ে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেন।
  • লৌহমানবের পদক্ষেপ: হায়দ্রাবাদ ও জুনাগড়ের মতো যে রাজ্যগুলি ভারতের সাথে যুক্ত হতে অস্বীকার করেছিল, সেখানে তিনি কঠোর হাতে পুলিশি ও সামরিক অভিযান চালিয়ে তাদের ভারতের সাথে যুক্ত হতে বাধ্য করেন। এই অসামান্য কৃতিত্বের জন্যই তাঁকে ‘ভারতের লৌহমানব’ বলা হয়।

21. ভারতের সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে ‘গণপরিষদ’ (Constituent Assembly)-এর ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর দেখো
  • গঠন: স্বাধীন ভারতের জন্য একটি নিজস্ব আইন ও নিয়মকানুন তৈরির উদ্দেশ্যে 1946 সালে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘গণপরিষদ’ গঠিত হয়। এর সভাপতি ছিলেন ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ।
  • সংবিধান রচনা: এই পরিষদের সদস্যরা প্রায় 2 বছর 11 মাস 18 দিন ধরে নিরলস পরিশ্রম ও বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে বিস্তৃত লিখিত সংবিধানটি রচনা করেছিলেন। 1949 সালের 26 নভেম্বর এই সংবিধানটি গণপরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।

22. স্বাধীন ভারতের সংবিধানে ড. বি. আর. আম্বেদকরের অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
ড. বি. আর. আম্বেদকরকে স্বাধীন ভারতের ‘সংবিধানের জনক’ বলা হয়:

  • খসড়া কমিটির প্রধান: তিনি ছিলেন গণপরিষদের ‘খসড়া কমিটি’ (Drafting Committee)-র চেয়ারম্যান। তাঁর অসাধারণ আইনি ও রাজনৈতিক জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই সংবিধানের মূল কাঠামোটি তৈরি হয়েছিল।
  • সামাজিক ন্যায়বিচার: তিনি সংবিধানে এমন কিছু আইন যুক্ত করেছিলেন যার মাধ্যমে ভারতের দলিত, অস্পৃশ্য এবং পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা সমান অধিকার ও মর্যাদা লাভ করেন এবং সমাজে বৈষম্যের অবসান ঘটে।

23. 1950 সালের 26 জানুয়ারি দিনটিকে কেন ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ (Republic Day) হিসেবে পালন করা হয়?

উত্তর দেখো
  • সংবিধান কার্যকর: 1949 সালে সংবিধান গৃহীত হলেও, তা আনুষ্ঠানিকভাবে সমগ্র দেশে কার্যকর করা হয়েছিল 1950 সালের 26 জানুয়ারি। এই দিন থেকে ভারত একটি গণতান্ত্রিক ও ‘প্রজাতন্ত্র’ (যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন) দেশে পরিণত হয়।
  • ঐতিহাসিক কারণ: 1930 সালের 26 জানুয়ারি জাতীয় কংগ্রেস প্রথম ‘পূর্ণ স্বরাজ’ বা স্বাধীনতা দিবস পালন করেছিল। সেই ঐতিহাসিক দিনটির স্মৃতি ও শপথকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই 26 জানুয়ারি দিনটিকেই সংবিধান কার্যকর করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল।

24. দেশভাগের ফলে বাংলার সমাজ ও অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়েছিল?

উত্তর দেখো
দেশভাগের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছিল বাংলার ওপর:

  • অর্থনৈতিক বিপর্যয়: বাংলার পাটকলগুলি পড়েছিল পশ্চিমবঙ্গে, কিন্তু পাট চাষের উর্বর জমিগুলি চলে গিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশ)। ফলে বাংলার শিল্প ও অর্থনীতি গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • উদ্বাস্তু সমস্যা ও বেকারত্ব: পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা লক্ষ লক্ষ মানুষের চাপে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি ও বাসস্থান ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং খাদ্যাভাব চরম আকার ধারণ করে, যা বাংলার সমাজজীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার