অষ্টম শ্রেণী: ভূগোল, অধ্যায় – 1, পৃথিবীর অন্দরমহল, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২
অধ্যায় 1: পৃথিবীর অন্দরমহল
(সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – মান: 2) – পর্ব 1
নিচের প্রশ্নগুলির দু-তিনটি বাক্যে উত্তর দাও:
1. পৃথিবীর অন্দরমহল সম্পর্কে আমরা কীভাবে জানতে পারি?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর অন্দরমহল সম্পর্কে সরাসরি জানার কোনো উপায় নেই। তবে ভূমিকম্পের তরঙ্গের গতিবিধি, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে বের হওয়া লাভা এবং উষ্ণ প্রস্রবণ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ভেতরের বিভিন্ন স্তর ও উপাদান সম্পর্কে জানতে পারেন।
2. খনি শ্রমিকরা খনির গভীরে গেলে গরম অনুভব করেন কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে যত গভীরে যাওয়া যায়, ভূগর্ভের তাপমাত্রা তত বাড়তে থাকে। সাধারণ হিসেবে, প্রতি 33 মিটার গভীরতায় 1°C করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই কারণেই খনি শ্রমিকরা খনির গভীরে গেলে প্রচণ্ড গরম অনুভব করেন।
3. ম্যাগমা (Magma) ও লাভা (Lava)-র মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
[Image of Magma vs Lava diagram]
উত্তর দেখো
উত্তর: ভূগর্ভের অত্যাধিক তাপে ও চাপে গলে যাওয়া তরল খনিজ পদার্থকে ‘ম্যাগমা’ বলে, যা ভূগর্ভেই থাকে। অন্যদিকে, সেই ম্যাগমা যখন আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ বা ভূত্বকের ফাটল দিয়ে ভূপৃষ্ঠের বাইরে বেরিয়ে আসে, তখন তাকে ‘লাভা’ বলে।
4. উষ্ণ প্রস্রবণ (Hot spring) কী? একটি উদাহরণ দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: ভূগর্ভস্থ জল পৃথিবীর ভেতরের তাপে ফুটতে থাকে এবং ভূতকের কোনো ফাটল দিয়ে যখন স্বাভাবিকভাবেই গরম জল বা বাষ্পরূপে প্রবল বেগে বাইরে বেরিয়ে আসে, তখন তাকে উষ্ণ প্রস্রবণ বলে। উদাহরণ: পশ্চিমবঙ্গের বক্রেশ্বর।
5. ‘ভূতক’ (Crust) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর সবচেয়ে ওপরের কঠিন, পাতলা শিলাস্তরটিকে ভূতক বলে, যার ওপরে আমরা বাস করি। এটি পৃথিবীর মোট আয়তনের মাত্র 1% দখল করে আছে এবং এর গড় গভীরতা প্রায় 30 কিলোমিটার। এটি সিয়াল ও সিমা—এই দুটি স্তরে বিভক্ত।
6. ‘সিয়াল’ (SIAL) স্তর বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
উত্তর: মহাদেশের তলদেশে অবস্থিত ভূতকের ওপরের স্তরটি প্রধানত সিলিকন (Si) এবং অ্যালুমিনিয়াম (Al) দিয়ে গঠিত। এই দুই উপাদানের নামের প্রথম অংশ নিয়ে এই স্তরটিকে সংক্ষেপে ‘সিয়াল’ (SIAL) বলা হয়। এটি গ্রানাইট শিলা দ্বারা গঠিত এবং অপেক্ষাকৃত হালকা।
7. ‘সিমা’ (SIMA) স্তর বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
উত্তর: মহাসাগরের তলদেশে অবস্থিত ভূতকের নীচের স্তরটি প্রধানত সিলিকন (Si) এবং ম্যাগনেসিয়াম (Mg) দিয়ে গঠিত। এই দুই উপাদানের নামের প্রথম অংশ নিয়ে একে সংক্ষেপে ‘সিমা’ (SIMA) বলা হয়। এটি ব্যাসল্ট শিলা দ্বারা গঠিত এবং সিয়ালের চেয়ে ভারী।
8. সিয়াল ও সিমার মধ্যে দুটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: 1) সিয়াল মূলত মহাদেশের তলদেশ তৈরি করেছে, অন্যদিকে সিমা মহাসাগরের তলদেশ তৈরি করেছে। 2) সিয়াল হালকা গ্রানাইট শিলা দিয়ে গঠিত, কিন্তু সিমা অপেক্ষাকৃত ভারী ব্যাসল্ট শিলা দিয়ে গঠিত।
9. বিযুক্তি রেখা (Discontinuity Line) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর অভ্যন্তরে দুটি আলাদা স্তরের সংযোগস্থলে ঘনত্ব, উপাদান এবং ভূকম্পীয় তরঙ্গের গতিবেগ যেখানে হঠাৎ করে পরিবর্তিত হয় বা আলাদা হয়ে যায়, সেই সীমারেখাকে বিযুক্তি রেখা বলে। যেমন- ভূতক ও গুরুমণ্ডলের মাঝে মোহো বিযুক্তি রেখা।
10. ‘গুরুমণ্ডল’ (Mantle) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
উত্তর: ভূতকের ঠিক নীচে থেকে কেন্দ্রমণ্ডলের ওপর পর্যন্ত (প্রায় 2900 কিমি গভীর) বিস্তৃত স্তরটিকে গুরুমণ্ডল বলে। এটি পৃথিবীর মোট আয়তনের প্রায় 84% দখল করে আছে এবং এর তাপমাত্রা প্রায় 2000°C থেকে 3000°C।
11. ‘ক্রফেসিমা’ (CROFESIMA) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
উত্তর: গুরুমণ্ডলের ওপরের অংশ বা বহিঃগুরুমণ্ডল প্রধানত ক্রোমিয়াম (Cr), লোহা (Fe), সিলিকন (Si) এবং ম্যাগনেসিয়াম (Mg) দিয়ে গঠিত। এই উপাদানগুলির নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে এই স্তরটিকে সংক্ষেপে ক্রফেসিমা (CROFESIMA) বলা হয়।
12. ‘নিফেসিমা’ (NIFESIMA) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
উত্তর: গুরুমণ্ডলের নীচের অংশ বা অন্তঃগুরুমণ্ডল প্রধানত নিকেল (Ni), লোহা (Fe), সিলিকন (Si) এবং ম্যাগনেসিয়াম (Mg) দিয়ে গঠিত। এই উপাদানগুলির নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে এই স্তরটিকে সংক্ষেপে নিফেসিমা (NIFESIMA) বলা হয়।
13. শিলামণ্ডল বা লিথোস্ফিয়ার (Lithosphere) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর একেবারে ওপরের কঠিন আবরণ অর্থাৎ ভূতক এবং গুরুমণ্ডলের একেবারে ওপরের কিছু কঠিন অংশ মিলিয়ে যে স্তর তৈরি হয়েছে, তাকে শিলামণ্ডল বা লিথোস্ফিয়ার বলে। এর গড় গভীরতা বা বেধ প্রায় 100 কিলোমিটার।
14. পরিচলন স্রোত (Convection Current) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
উত্তর: ভূগর্ভের তাপে গুরুমণ্ডলের সান্দ্র (অর্ধতরল) পদার্থগুলি উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে ওপরের দিকে ওঠে এবং ওপরের অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা ও ভারী পদার্থ নীচে নেমে যায়। এইভাবে ওপর-নীচ চলাচলের মাধ্যমে যে স্রোতের সৃষ্টি হয়, তাকে পরিচলন স্রোত বা Convection current বলে।
15. অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার (Asthenosphere) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: শিলামণ্ডলের ঠিক নীচে এবং গুরুমণ্ডলের একেবারে ওপরের অংশে অবস্থিত সান্দ্র বা অর্ধতরল স্তরটিকে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার বলে। গ্রিক শব্দ ‘অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার’-এর অর্থ হলো ‘দুর্বল স্তর’। এই স্তরেই পরিচলন স্রোতের সৃষ্টি হয়।
16. কেন্দ্রমণ্ডল (Core) কাকে বলে? এর প্রধান উপাদান কী কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: গুরুমণ্ডলের ঠিক নীচে অর্থাৎ 2900 কিমি গভীরতা থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র (6370 কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত সবচেয়ে ভারী স্তরটিকে কেন্দ্রমণ্ডল বলে। এই স্তরটি প্রধানত অত্যন্ত ভারী দুটি উপাদান— নিকেল (Ni) এবং লোহা (Fe) দিয়ে তৈরি।
17. কেন্দ্রমণ্ডলকে ‘নিফে’ (NIFE) বলা হয় কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর একেবারে ভেতরের স্তর বা কেন্দ্রমণ্ডল প্রধানত দুটি অতি ভারী খনিজ উপাদান— নিকেল (Nickel – Ni) এবং লোহা (Ferrum – Fe) দিয়ে তৈরি। এই দুটি উপাদানের বৈজ্ঞানিক নামের প্রথম দুটি অক্ষর (Ni + Fe) একসঙ্গে জুড়ে এই স্তরটিকে সংক্ষেপে নিফে (NIFE) বলা হয়।
18. বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল (Outer Core) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
উত্তর: কেন্দ্রমণ্ডলের ওপরের অংশটি (2900 কিমি থেকে 5150 কিমি গভীরতা পর্যন্ত) বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল নামে পরিচিত। এখানকার চাপ, তাপ ও ঘনত্ব অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের তুলনায় কিছুটা কম হওয়ায় এই স্তরটি অর্ধকঠিন বা তরল অবস্থায় রয়েছে।
19. অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল (Inner Core) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
উত্তর: কেন্দ্রমণ্ডলের একেবারে ভেতরের বা নীচের অংশটি (5150 কিমি থেকে 6370 কিমি গভীরতা পর্যন্ত) অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল নামে পরিচিত। এখানকার তাপ প্রায় 5000°C হলেও, ওপরের স্তরগুলির প্রচণ্ড চাপের কারণে এই স্তরটি নিরেট বা কঠিন অবস্থায় রয়েছে।
20. পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic Field) কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর আবর্তনের সাথে সাথে তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলে থাকা লোহা ও নিকেলের স্রোতও অনবরত ঘুরতে থাকে। এর ফলে সেখানে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক প্রবাহের সৃষ্টি হয়, যা থেকেই পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র বা Magnetic field তৈরি হয়েছে।
21. টেকটনিক পাত বা পাত (Tectonic Plates) কী?
[Image of Earth tectonic plates map]
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর শিলামণ্ডল বা লিথোস্ফিয়ার কোনো একটি অখণ্ড আবরণ নয়, বরং এটি বেশ কয়েকটি ছোটো-বড়ো কঠিন ও দৃঢ় খণ্ডে বিভক্ত। এই ভাসমান ও চলনশীল বিশাল শিলাখণ্ডগুলিকেই টেকটনিক পাত বা Plate বলা হয়।
22. পৃথিবীর স্তরগুলির মধ্যে কেন্দ্রমণ্ডলের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবী যখন সৃষ্টি হয়েছিল, তখন সেটি একটি উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিণ্ড ছিল। ধীরে ধীরে ঠান্ডা হওয়ার সময় অভিকর্ষের টানে লোহা ও নিকেলের মতো সবচেয়ে ভারী পদার্থগুলি পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রের দিকে জমা হয়ে কেন্দ্রমণ্ডল তৈরি করেছে, তাই এর ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি।
23. পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রচণ্ড তাপ থাকলেও অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল কঠিন অবস্থায় রয়েছে কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা প্রায় 5000°C। কিন্তু এর ঠিক ওপরে থাকা পৃথিবীর বাকি বিশাল স্তরগুলির (ভূতক, গুরুমণ্ডল ও বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল) অত্যাধিক চাপের কারণে এখানকার পদার্থগুলি গলতে পারে না, তাই এটি কঠিন অবস্থায় রয়েছে।
24. ভূতক ও গুরুমণ্ডলের মধ্যে দুটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: 1) ভূতক হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ওপরের ও পাতলা স্তর (গভীরতা 30 কিমি), কিন্তু গুরুমণ্ডল হলো ভূতকের নীচের সবচেয়ে পুরু স্তর (গভীরতা 2900 কিমি)। 2) ভূতকের প্রধান উপাদান সিলিকা ও অ্যালুমিনিয়াম, অন্যদিকে গুরুমণ্ডল লোহা, নিকেল ও ক্রোমিয়াম দিয়ে তৈরি।
25. কনরাড ও মোহো বিযুক্তি রেখা কোথায় কোথায় অবস্থিত?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1) কনরাড বিযুক্তি রেখা ভূতকের দুটি স্তর— মহাদেশীয় ভূতক (সিয়াল) এবং মহাসাগরীয় ভূতকের (সিমা) মাঝে অবস্থিত। 2) মোহো বিযুক্তি রেখা ভূতক এবং গুরুমণ্ডলের সংযোগস্থলে অবস্থিত।
26. গুটেনবার্গ ও লেহম্যান বিযুক্তি রেখা কোথায় কোথায় অবস্থিত?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1) গুটেনবার্গ বিযুক্তি রেখা গুরুমণ্ডল এবং কেন্দ্রমণ্ডলের মাঝে অবস্থিত। 2) লেহম্যান বিযুক্তি রেখা কেন্দ্রমণ্ডলের দুটি অংশ— বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল এবং অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের মাঝে অবস্থিত।