অষ্টম শ্রেণী: ভূগোল, অধ্যায় -1 পৃথিবীর অন্দরমহল, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5

অধ্যায় 1: পৃথিবীর অন্দরমহল
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. চিত্রসহ পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগের স্তরবিন্যাস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
ভূমিকা: ভূকম্পীয় তরঙ্গের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অন্দরমহলকে প্রধানত তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন— 1) ভূতক, 2) গুরুমণ্ডল এবং 3) কেন্দ্রমণ্ডল।

1. ভূতক (Crust): পৃথিবীর একেবারে বাইরের কঠিন ও সবচেয়ে পাতলা আবরণটি হলো ভূতক। এর গড় গভীরতা প্রায় 30 কিমি। ভূতক দুটি অংশে বিভক্ত:

  • সিয়াল (SIAL): মহাদেশের নীচের অংশ সিলিকন ও অ্যালুমিনিয়াম দ্বারা গঠিত, একে সিয়াল বলে। এটি গ্রানাইট শিলা দ্বারা গঠিত এবং অপেক্ষাকৃত হালকা।
  • সিমা (SIMA): মহাসাগরের নীচের অংশ সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়াম দ্বারা গঠিত, একে সিমা বলে। এটি ভারী ব্যাসল্ট শিলা দ্বারা গঠিত। সিয়াল ও সিমার মাঝে কনরাড বিযুক্তি রেখা রয়েছে।

2. গুরুমণ্ডল (Mantle): ভূতকের নীচে থেকে কেন্দ্রমণ্ডলের ওপর পর্যন্ত প্রায় 2900 কিমি গভীর স্তরটিকে গুরুমণ্ডল বলে। পৃথিবীর মোট আয়তনের 84% এই স্তরটি দখল করে আছে। ভূতক ও গুরুমণ্ডলের মাঝে মোহো বিযুক্তি রেখা অবস্থিত। এটি দুটি অংশে বিভক্ত:

  • বহিঃগুরুমণ্ডল (ক্রফেসিমা): ক্রোমিয়াম, লোহা, সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়াম দিয়ে গঠিত এই স্তরের গভীরতা 30-700 কিমি। এখানেই সান্দ্র ‘অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার’ অবস্থিত।
  • অন্তঃগুরুমণ্ডল (নিফেসিমা): নিকেল, লোহা, সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়াম দিয়ে গঠিত এই স্তরের গভীরতা 700-2900 কিমি। এই দুটি স্তরের মাঝে রেপিত্তি বিযুক্তি রেখা রয়েছে।

3. কেন্দ্রমণ্ডল (Core): গুরুমণ্ডলের নীচ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র (6370 কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত স্তরটি হলো কেন্দ্রমণ্ডল। গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডলের মাঝে গুটেনবার্গ বিযুক্তি রেখা রয়েছে। এটি ভারী নিকেল ও লোহা (নিফে) দিয়ে গঠিত। এটি দুটি অংশে বিভক্ত:

  • বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল: চাপ কম থাকায় এটি তরল বা অর্ধকঠিন অবস্থায় রয়েছে। এখানকার তরল লোহার স্রোত থেকেই পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
  • অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল: ওপরের স্তরগুলির প্রচণ্ড চাপের কারণে প্রায় 5000°C তাপমাত্রা থাকা সত্ত্বেও এটি কঠিন অবস্থায় রয়েছে। এই দুটি স্তরের মাঝে লেহম্যান বিযুক্তি রেখা রয়েছে।

2. পৃথিবীর ‘পরিচলন স্রোত’ (Convection Current) এবং ‘পাত সংস্থান তত্ত্ব’ (Plate Tectonics) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
ভূমিকা: আমাদের পায়ের নীচের কঠিন মাটি বা শিলামণ্ডল স্থির নয়, এটি প্রতিনিয়ত অত্যন্ত ধীর গতিতে চলাচল করছে। এই চলাচলের মূল কারণ হলো ভূগর্ভের পরিচলন স্রোত এবং টেকটনিক পাত।

টেকটনিক পাত ও শিলামণ্ডল:
পৃথিবীর ওপরের আবরণ অর্থাৎ ভূতক এবং গুরুমণ্ডলের একেবারে ওপরের কিছু কঠিন অংশ নিয়ে ‘শিলামণ্ডল’ গঠিত। এই শিলামণ্ডল কোনো অখণ্ড গোলক নয়, বরং এটি বেশ কয়েকটি ছোটো-বড়ো কঠিন টুকরোয় বিভক্ত। এই ভাসমান ও চলনশীল বিশাল শিলাখণ্ডগুলিকেই ‘টেকটনিক পাত’ বলা হয়। পৃথিবীতে মূলত 6টি বড়ো এবং একাধিক ছোটো পাত রয়েছে।

অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার ও পরিচলন স্রোত:
শিলামণ্ডলের ঠিক নীচে গুরুমণ্ডলের ওপরের অংশে একটি সান্দ্র বা পিচ্ছিল স্তর রয়েছে, যার নাম অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার। ভূগর্ভের অত্যাধিক তাপে এখানকার পদার্থগুলি উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে ওপরের দিকে ওঠে এবং ওপরের অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা ও ভারী পদার্থ নীচে নেমে যায়। পদার্থের এই চক্রাকার ওপর-নীচ চলাচলের মাধ্যমেই ভূগর্ভে শক্তিশালী ‘পরিচলন স্রোত’-এর সৃষ্টি হয়।

পাতগুলির চলন ও প্রভাব:
অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের এই পরিচলন স্রোতের ওপরে ভর করেই পৃথিবীর কঠিন টেকটনিক পাতগুলি ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। স্রোতের ধাক্কায় পাতগুলি অত্যন্ত ধীর গতিতে (বছরে কয়েক মিলিমিটার বা সেন্টিমিটার) একে অপরের দিকে এগিয়ে আসে বা দূরে সরে যায়। পাতগুলির এই চলনের ফলেই পৃথিবীতে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক ঘটনা ঘটে, যেমন—

  • দুটি পাত একে অপরের সাথে ধাক্কা খেলে প্রবল ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
  • পাতের সংযোগস্থলের ফাটল দিয়ে ম্যাগমা বাইরে বেরিয়ে এসে আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি করে।
  • দুটি পাতের প্রবল চাপে মাঝখানের পলি ভাঁজ খেয়ে ভঙ্গিল পর্বত (যেমন- হিমালয়) তৈরি হয়।

3. পৃথিবীর অন্দরমহল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের প্রধান উপায় বা উৎসগুলি কী কী? বিজ্ঞানীরা কীভাবে এই স্তরগুলি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন?

উত্তর দেখো
ভূমিকা: পৃথিবীর ব্যাসার্ধ প্রায় 6370 কিমি। অত্যাধিক তাপ (কেন্দ্রে প্রায় 5000°C) এবং প্রচণ্ড চাপের কারণে মানুষের পক্ষে পৃথিবীর গভীরে প্রবেশ করা একেবারেই অসম্ভব। তা সত্ত্বেও বিজ্ঞানীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কিছু প্রাকৃতিক উপাদানের সাহায্য নিয়ে পৃথিবীর অন্দরমহলের নিখুঁত স্তরবিন্যাস আবিষ্কার করেছেন।

তথ্য সংগ্রহের প্রধান উপায়গুলি হলো:

  • 1. ভূমিকম্পের তরঙ্গ (প্রধান পরোক্ষ উৎস): পৃথিবীর অন্দরমহল সম্পর্কে জানার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হলো ভূকম্পীয় তরঙ্গ। ভূমিকম্পের সময় সৃষ্ট P-তরঙ্গ (Primary) এবং S-তরঙ্গ (Secondary) পৃথিবীর ভেতরের দিকে অগ্রসর হয়। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, পৃথিবীর গভীরে যাওয়ার সময় বিভিন্ন স্তরে এই তরঙ্গগুলির গতিবেগ হঠাৎ করে বেড়ে বা কমে যায়, এমনকি দিকও পরিবর্তন হয়। এর থেকেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন যে পৃথিবীর ভেতরের উপাদান সব জায়গায় সমান নয়, এটি বিভিন্ন ঘনত্বের কয়েকটি স্তরে (ভূতক, গুরুমণ্ডল, কেন্দ্রমণ্ডল) বিভক্ত।
  • 2. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত (প্রত্যক্ষ উৎস): আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে ভূগর্ভ থেকে যে উত্তপ্ত, গলিত লাভা এবং ছাই বাইরে বেরিয়ে আসে, তা সরাসরি পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা ভূগর্ভের পদার্থ, খনিজ উপাদান এবং সেখানকার অত্যাধিক তাপ ও চাপ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান।
  • 3. উষ্ণ প্রস্রবণ: মাটির নীচের ফুটন্ত জল যখন সুড়ঙ্গ বা ফাটল দিয়ে উষ্ণ প্রস্রবণ হিসেবে বেরিয়ে আসে, তা প্রমাণ করে যে পৃথিবীর পৃষ্ঠের নীচে এক বিশাল তাপভাণ্ডার বা ম্যাগমা প্রকোষ্ঠ লুকিয়ে রয়েছে।
  • 4. পৃথিবীর ঘনত্ব হিসাব: সমগ্র পৃথিবীর গড় ঘনত্ব (5.5 গ্রাম/ঘন সেমি) ভূতকের ঘনত্বের (2.6 – 3.3 গ্রাম/ঘন সেমি) তুলনায় অনেক বেশি। এর থেকে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকের স্তরগুলি অত্যন্ত ভারী এবং ঘন লোহা ও নিকেল দিয়ে তৈরি।

4. শিলামণ্ডল (Lithosphere) ও অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার (Asthenosphere)-এর মধ্যে সম্পর্ক কী? পৃথিবীর টেকটনিক পাতগুলি কেন গতিশীল হয়? (2+3=5)

উত্তর দেখো
শিলামণ্ডল ও অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের সম্পর্ক:

  • পৃথিবীর একেবারে বাইরের কঠিন শিলাবরণ (ভূতক ও গুরুমণ্ডলের ওপরের কঠিন অংশ) হলো শিলামণ্ডল। অন্যদিকে, শিলামণ্ডলের ঠিক নীচে গুরুমণ্ডলের ওপরের অংশে থাকা সান্দ্র (অর্ধতরল বা পিচ্ছিল) স্তরটি হলো অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার।
  • সম্পর্কটি হলো— কঠিন শিলামণ্ডল কোনো টানা বা অখণ্ড আবরণ নয়, এটি ফাটল বরাবর বেশ কিছু টুকরো বা ‘পাত’-এ বিভক্ত। এই কঠিন পাতগুলি সরাসরি নীচের তরল ও পিচ্ছিল অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার স্তরের ওপর ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ একটি কঠিন নৌকা যেমন জলের ওপর ভাসে, শিলামণ্ডল ঠিক সেভাবেই অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের ওপর ভাসছে।

টেকটনিক পাতগুলি গতিশীল হওয়ার কারণ:

  • পরিচলন স্রোত: পাতগুলির গতির মূল কারণ হলো ভূগর্ভের তাপ এবং পরিচলন স্রোত। অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার স্তরের সান্দ্র পদার্থগুলি ভূগর্ভের অত্যাধিক তাপে গলে গিয়ে উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে ওপরের দিকে ওঠে এবং ওপরের অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা ও ভারী পদার্থ নীচে নেমে যায়।
  • স্রোতের ধাক্কা: পদার্থের এই চক্রাকার ওপর-নীচ চলাচলের মাধ্যমেই শক্তিশালী ‘পরিচলন স্রোত’-এর সৃষ্টি হয়। এই স্রোত যখন নীচ থেকে ওপরের দিকে উঠে শিলামণ্ডলের পাতগুলিতে ধাক্কা মারে, তখন ভাসমান পাতগুলি অত্যন্ত ধীর গতিতে (বছরে কয়েক সেন্টিমিটার) একে অপরের দিকে বা দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়।

5. বিযুক্তি রেখা (Discontinuity Line) কাকে বলে? পৃথিবীর অভ্যন্তরের প্রধান তিনটি বিযুক্তি রেখার নাম ও অবস্থান উল্লেখ করো। (2+3=5)

উত্তর দেখো
বিযুক্তি রেখার সংজ্ঞা:
পৃথিবীর অভ্যন্তরে দুটি আলাদা স্তরের সংযোগস্থলে ঘনত্ব, খনিজ উপাদান এবং ভূকম্পীয় তরঙ্গের গতিবেগ যেখানে হঠাৎ করে পরিবর্তিত হয় বা আলাদা হয়ে যায়, সেই নির্দিষ্ট সীমারেখাকেই ভূতত্ত্ববিজ্ঞানে বিযুক্তি রেখা বলা হয়। বিজ্ঞানীরা ভূকম্পন তরঙ্গের পরিবর্তনের ধরন দেখেই এই রেখাগুলি আবিষ্কার করেছেন।

প্রধান তিনটি বিযুক্তি রেখার অবস্থান:
পৃথিবীর অভ্যন্তরে মূলত 5টি বিযুক্তি রেখা থাকলেও প্রধান 3টি বিযুক্তি রেখা হলো:

  • 1. মোহো বিযুক্তি রেখা (Mohorovicic Discontinuity): এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ওপরের স্তর ‘ভূতক’ এবং তার নীচের স্তর ‘গুরুমণ্ডল’-এর ঠিক সংযোগস্থলে বা মাঝে অবস্থিত।
  • 2. গুটেনবার্গ বিযুক্তি রেখা (Gutenberg Discontinuity): এটি পৃথিবীর মাঝের স্তর ‘গুরুমণ্ডল’ এবং একেবারে ভেতরের স্তর ‘কেন্দ্রমণ্ডল’-এর সংযোগস্থলে বা মাঝে অবস্থিত (প্রায় 2900 কিমি গভীরতায়)।
  • 3. লেহম্যান বিযুক্তি রেখা (Lehmann Discontinuity): এটি কেন্দ্রমণ্ডলের দুটি অংশের মাঝে, অর্থাৎ তরল ‘বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল’ এবং কঠিন ‘অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল’-এর মাঝে অবস্থিত (প্রায় 5150 কিমি গভীরতায়)।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার