অষ্টম শ্রেণী: ভূগোল, অধ্যায় – 2 অস্তিত পৃথিবী, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২
অধ্যায় 2: অস্থিত পৃথিবী
(সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – মান: 2) – পর্ব 1
নিচের প্রশ্নগুলির দু-তিনটি বাক্যে উত্তর দাও:
1. ‘প্যানজিয়া’ (Pangea) এবং ‘প্যানথালাসা’ (Panthalassa) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
উত্তর: আজ থেকে প্রায় 30 কোটি বছর আগে পৃথিবীর সমস্ত স্থলভাগ বা মহাদেশগুলি একসাথে যুক্ত হয়ে যে একটিমাত্র বিশাল ভূখণ্ড গঠন করেছিল, তাকে ‘প্যানজিয়া’ বলা হয়। আর এই প্যানজিয়ার চারপাশে যে একটানা বিশাল জলভাগ বা মহাসাগর ছিল, তাকে ‘প্যানথালাসা’ বলা হতো।
2. মহাদেশীয় সরণ তত্ত্ব (Continental Drift Theory) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1912 সালে জার্মান আবহবিদ আলফ্রেড ওয়েগনার এই তত্ত্বটি প্রকাশ করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রায় 20 কোটি বছর আগে পৃথিবীর আদিম ভূখণ্ড ‘প্যানজিয়া’ ভাঙতে শুরু করে এবং এর টুকরোগুলি ভাসমান অবস্থায় ক্রমশ একে অপরের থেকে দূরে সরে গিয়ে বর্তমানের মহাদেশ ও মহাসাগরগুলি তৈরি করেছে।
3. পাত বা টেকটনিক পাত (Tectonic Plate) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর একেবারে ওপরের কঠিন আবরণ অর্থাৎ শিলামণ্ডল কোনো টানা বা অখণ্ড আবরণ নয়, এটি ফাটল বরাবর বেশ কয়েকটি ছোটো-বড়ো টুকরোয় বিভক্ত। শিলামণ্ডলের এই বিশাল, কঠিন এবং চলনশীল শিলাখণ্ডগুলিকেই ভূতত্ত্ববিজ্ঞানে পাত বা টেকটনিক পাত বলা হয়।
4. পাত সংস্থান তত্ত্ব অনুযায়ী পৃথিবীর প্রধান কয়েকটি পাতের নাম লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: পাত সংস্থান তত্ত্ব অনুযায়ী পৃথিবীতে মোট 6টি প্রধান বা বৃহৎ পাত রয়েছে। এগুলি হলো— 1) ইউরেশীয় পাত, 2) ভারতীয় পাত, 3) আমেরিকান পাত, 4) আফ্রিকা পাত, 5) প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত (বৃহত্তম) এবং 6) আন্টার্কটিকা পাত।
5. পৃথিবীর পাতগুলি গতিশীল হওয়ার বা চলাচল করার প্রধান কারণ কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর পাতগুলির নীচে থাকা গুরুমণ্ডলের অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার স্তরটি অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং সান্দ্র অবস্থায় রয়েছে। ভূগর্ভের অত্যধিক তাপে এই স্তরে সৃষ্ট ম্যাগমার চক্রাকার ‘পরিচলন স্রোত’-এর ওপর ভর করেই ভাসমান পাতগুলি ধীর গতিতে চলাচল করে।
6. অভিসারী পাত সীমানাকে (Convergent Boundary) ‘বিনাশী’ পাত সীমানা বলা হয় কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: এই সীমানায় দুটি পাত একে অপরের দিকে অগ্রসর হয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এর ফলে ভারী পাতটি হালকা পাতের নীচে ঢুকে গিয়ে পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রচন্ড তাপে গলে যায় বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পাতের এই বিনাশ ঘটার জন্যই একে বিনাশী পাত সীমানা বলে।
7. প্রতিসারী পাত সীমানাকে (Divergent Boundary) ‘গঠনকারী’ পাত সীমানা বলা হয় কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: এই সীমানায় দুটি পাত একে অপরের থেকে বিপরীত দিকে বা দূরে সরে যায়। তখন মাঝখানের ফাটল দিয়ে ভূগর্ভের উত্তপ্ত ম্যাগমা বাইরে বেরিয়ে এসে ঠান্ডা হয়ে নতুন ভূতক বা সামুদ্রিক শৈলশিরা গঠন করে। নতুন ভূতক গঠিত হয় বলেই একে গঠনকারী পাত সীমানা বলে।
8. নিরপেক্ষ পাত সীমানা (Transform Boundary) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
উত্তর: যখন দুটি পাত একে অপরের সমান্তরালে পাশাপাশি ঘষে অগ্রসর হয়, তখন তাদের মধ্যে কোনো মুখোমুখি সংঘর্ষ বা দূরে সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটে না। ফলে এখানে ভূতক ধ্বংস বা সৃষ্টি কোনোটিই হয় না বলে একে নিরপেক্ষ পাত সীমানা বলে (যেমন- ক্যালিফোর্নিয়ার সান আন্দ্রিয়াজ চ্যুতি)।
9. ভঙ্গিল পর্বত (Fold Mountain) কীভাবে সৃষ্টি হয়?
উত্তর দেখো
উত্তর: অভিসারী পাত সীমানায় দুটি পাত যখন একে অপরের দিকে এগিয়ে এসে প্রবল জোরে ধাক্কা খায়, তখন সেই দুই পাতের মাঝখানে থাকা সমুদ্রের তলদেশের পলিস্তরে প্রচন্ড পার্শ্বচাপ পড়ে। সেই পলিস্তর ভাঁজ খেয়ে ওপরের দিকে উঠে গিয়েই হিমালয় বা আল্পস-এর মতো নবীন ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টি করে।
10. ভূমিকম্প (Earthquake) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর অভ্যন্তরে টেকটনিক পাতগুলির আকস্মিক চলন, সংঘর্ষ বা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে ভূগর্ভে সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্ত হয়ে যায়। এই শক্তির প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের কিছু অংশ যখন ক্ষণিকের জন্য প্রবলভাবে কেঁপে ওঠে, তখন তাকে ভূমিকম্প বলে।
11. ভূমিকম্পের কেন্দ্র (Focus) ও উপকেন্দ্র (Epicenter)-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: ভূগর্ভের অভ্যন্তরে যে নির্দিষ্ট স্থানে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, তাকে কেন্দ্র বলে। অন্যদিকে, সেই কেন্দ্রের ঠিক সোজাসুজি বা উলম্বভাবে ভূপৃষ্ঠের ওপরে অবস্থিত যে স্থানে ভূকম্পন তরঙ্গ সবচেয়ে আগে পৌঁছায় এবং যেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাকে উপকেন্দ্র বলে।
12. সিসমোগ্রাফ (Seismograph) এবং রিখটার স্কেল (Richter Scale)-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: সিসমোগ্রাফ হলো একটি যন্ত্র, যার সাহায্যে ভূমিকম্পের তরঙ্গের গতিবিধি, উৎপত্তিস্থল এবং স্থায়িত্ব রেকর্ড করা হয়। অন্যদিকে, রিখটার স্কেল কোনো যন্ত্র নয়, এটি একটি গাণিতিক স্কেল বা পরিমাপক, যার সাহায্যে ভূমিকম্পের তীব্রতা বা ধ্বংস করার ক্ষমতা মাপা হয় (সূচক 0-10)।
13. ভূমিকম্পের তরঙ্গ প্রধানত কয় প্রকার ও কী কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: ভূমিকম্পের তরঙ্গ প্রধানত তিন প্রকার। 1) P-তরঙ্গ বা প্রাথমিক তরঙ্গ (সবচেয়ে দ্রুতগামী), 2) S-তরঙ্গ বা দ্বিতীয় পর্যায়ের তরঙ্গ এবং 3) L-তরঙ্গ বা পৃষ্ঠ তরঙ্গ (সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক, যা ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়)।
14. আগ্নেয়গিরি (Volcano) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
উত্তর: ভূতকের কোনো দুর্বল ফাটল বা গর্ত দিয়ে ভূগর্ভের উত্তপ্ত ম্যাগমা, গ্যাস, জলীয় বাষ্প, ভস্ম ও পাথর লাভা রূপে প্রবল বেগে বা শান্তভাবে ভূপৃষ্ঠের বাইরে বেরিয়ে এলে, তাকে আগ্নেয়গিরি বলে। এই নির্গমনের প্রক্রিয়াকেই অগ্ন্যুৎপাত বলা হয়।
15. আগ্নেয়গিরির ‘জ্বালামুখ’ (Crater) এবং ‘ম্যাগমা প্রকোষ্ঠ’ (Magma Chamber) কী?
[Image of volcano cross section with magma chamber and crater]
উত্তর দেখো
উত্তর: আগ্নেয়গিরির চূড়ায় থাকা যে ফানেল আকৃতির গর্ত বা পথ দিয়ে ভূগর্ভের লাভা বাইরে বেরিয়ে আসে, তাকে জ্বালামুখ বলে। অন্যদিকে, আগ্নেয়গিরির ঠিক নীচে ভূগর্ভের যে বিশাল গহ্বরে গলিত ম্যাগমা সঞ্চিত থাকে, তাকে ম্যাগমা প্রকোষ্ঠ বলা হয়।
16. সক্রিয়তা বা অগ্ন্যুৎপাতের প্রকৃতি অনুসারে আগ্নেয়গিরিকে কয় ভাগে ভাগ করা যায় ও কী কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: অগ্ন্যুৎপাতের সক্রিয়তা বা স্থায়িত্ব অনুযায়ী আগ্নেয়গিরিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা— 1) জীবন্ত বা সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, 2) সুপ্ত আগ্নেয়গিরি এবং 3) মৃত আগ্নেয়গিরি।
17. জীবন্ত বা সক্রিয় আগ্নেয়গিরি (Active Volcano) কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: যেসব আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে এখনো পর্যন্ত নিয়মিতভাবে বা প্রায়শই অগ্ন্যুৎপাত ঘটিয়ে চলেছে, তাদের জীবন্ত বা সক্রিয় আগ্নেয়গিরি বলে। উদাহরণ: ভারতের আন্দামানের ব্যারেন দ্বীপ এবং ইতালির মাউন্ট এটনা।
18. সুপ্ত আগ্নেয়গিরি (Dormant Volcano) কাকে বলে? উদাহরণ দাও。
উত্তর দেখো
উত্তর: যেসব আগ্নেয়গিরিতে অতীতে অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে, বর্তমানে শান্ত বা ঘুমন্ত অবস্থায় আছে কিন্তু ভবিষ্যতে যেকোনো সময় আবার ভয়ঙ্করভাবে অগ্ন্যুৎপাত হতে পারে, তাদের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি বলে। উদাহরণ: জাপানের ফুজিয়ামা এবং ইতালির ভিসুভিয়াস।
19. মৃত আগ্নেয়গিরি (Extinct Volcano) কাকে বলে? উদাহরণ দাও。
উত্তর দেখো
উত্তর: যেসব আগ্নেয়গিরিতে সুদীর্ঘকাল ধরে (কয়েক হাজার বছর) কোনো অগ্ন্যুৎপাত হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই, তাদের মৃত আগ্নেয়গিরি বলে। উদাহরণ: মায়ানমারের পোপো এবং মেক্সিকোর পারিকুটিন।
20. ইতালির ‘স্ট্রম্বলি’ (Stromboli) আগ্নেয়গিরিকে ‘ভূমধ্যসাগরের আলোকস্তম্ভ’ বলা হয় কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ইতালির লিপারি দ্বীপে অবস্থিত স্ট্রম্বলি একটি অত্যন্ত সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। এর জ্বালামুখ থেকে প্রতিনিয়ত ও অবিরাম উত্তপ্ত লাভা নির্গত হতে থাকে, যার আলোতে রাতের বেলাতেও ভূমধ্যসাগর আলোকিত হয়ে থাকে। তাই একে ভূমধ্যসাগরের আলোকস্তম্ভ বলা হয়।
21. আগ্নেয় পর্বত (Volcanic Mountain) কীভাবে সৃষ্টি হয়?
উত্তর দেখো
উত্তর: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে জ্বালামুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা উত্তপ্ত লাভা, ছাই ও ভস্ম ক্রমশ জ্বালামুখের চারপাশে স্তরে স্তরে জমা হতে থাকে। বছরের পর বছর ধরে জমা হওয়া এই পদার্থগুলি ঠান্ডা ও কঠিন হয়ে যে মোচা বা শঙ্কু আকৃতির পর্বত তৈরি করে, তাকে আগ্নেয় পর্বত বলে।
22. ‘প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলা’ (Pacific Ring of Fire) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
উত্তর: পৃথিবীর অধিকাংশ (প্রায় 70%) আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল বরাবর একটি বলয় বা আংটির মতো অবস্থান করছে। আগ্নেয়গিরিগুলির এই বলয়াকার শৃঙ্খলকেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলা বলা হয়।
23. সুনামি (Tsunami) কাকে বলে? এর সৃষ্টির প্রধান কারণ কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘সুনামি’ একটি জাপানি শব্দ, যার অর্থ ‘বন্দরের ঢেউ’। সমুদ্রের তলদেশে বা উপকূলবর্তী অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্প বা অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সমুদ্রের জল ফুলে উঠে যে ধ্বংসাত্মক ও বিশাল ঢেউ নিয়ে উপকূলে আছড়ে পড়ে, তাকে সুনামি বলে।
24. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে কোনো সুফল বা উপকারিতা পাওয়া যায় কি?
উত্তর দেখো
উত্তর: হ্যাঁ, অগ্ন্যুৎপাতের ফলে অনেক সময় উপকারও হয়। নির্গত লাভা ঠান্ডা হয়ে যে কালো মাটির সৃষ্টি করে তা কৃষি কাজের জন্য অত্যন্ত উর্বর (যেমন- দাক্ষিণাত্যের মালভূমি)। এছাড়া অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ভূগর্ভের অনেক মূল্যবান খনিজ পদার্থ পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছাকাছি চলে আসে।
25. ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া কি সম্ভব? মানুষ কীভাবে সতর্ক হতে পারে?
উত্তর দেখো
উত্তর: আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এত উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও, বিজ্ঞানীরা এখনো পর্যন্ত ভূমিকম্পের কোনো সঠিক আগাম পূর্বাভাস বা সময় নির্ধারণ করতে পারেননি। তবে সিসমোগ্রাফ যন্ত্রের সাহায্যে ভূকম্পন প্রবণ এলাকাগুলি চিহ্নিত করে আগে থেকে মানুষকে সতর্ক করা এবং ভূকম্পন-সহনশীল বাড়ি তৈরি করা সম্ভব।