অষ্টম শ্রেণী: ভূগোল, অধ্যায় – 3 ‘শিলা’ রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5
অধ্যায় 3: শিলা
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. উৎপত্তি ও গঠনের ওপর ভিত্তি করে শিলাকে প্রধানত কয়টি ভাগে ভাগ করা যায়? প্রত্যেক প্রকার শিলার উৎপত্তির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। (1+4=5)
উত্তর দেখো
1. আগ্নেয় শিলার উৎপত্তি:
- পৃথিবীর সৃষ্টির আদিলগ্নে সম্পূর্ণ পৃথিবী একটি উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিণ্ড ছিল। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সেই উত্তপ্ত পিণ্ডটি ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে শীতল ও কঠিন হয়ে সর্বপ্রথম যে প্রাথমিক শিলার সৃষ্টি করে, তাকে আগ্নেয় শিলা বলে। এছাড়া, ভূগর্ভের উত্তপ্ত ও গলিত ম্যাগমা আগ্নেয়গিরির ফাটল দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে (লাভা রূপে) বা ভূগর্ভের ভেতরেই জমাট বেঁধে এই শিলা তৈরি করে (যেমন- ব্যাসল্ট, গ্রানাইট)।
2. পাললিক শিলার উৎপত্তি:
- বহু বছর ধরে নদী, বায়ু, হিমবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে প্রাচীন আগ্নেয় বা রূপান্তরিত শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ছোটো ছোটো টুকরো, বালি বা কাদায় পরিণত হয়। এই ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থগুলি সমুদ্র, হ্রদ বা নদীর তলদেশে বছরের পর বছর ধরে স্তরে স্তরে জমা হতে থাকে। পরবর্তীকালে ওপরের স্তরের প্রবল চাপে এবং খনিজ পদার্থের মিশ্রণে সেই পলি জমাট বেঁধে পাললিক শিলার সৃষ্টি করে (যেমন- বেলেপাথর, চুনাপাথর)।
3. রূপান্তরিত শিলার উৎপত্তি:
- ভূগর্ভের প্রচণ্ড তাপ, ওপরের শিলাস্তরের প্রবল চাপ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে অনেক সময় প্রাচীন আগ্নেয় ও পাললিক শিলার মূল গঠন, কাঠিন্য ও রং সম্পূর্ণ বদলে যায়। এইভাবে পূর্বের শিলা পরিবর্তিত হয়ে যে নতুন, কঠিন এবং মজবুত শিলা তৈরি হয়, তাকে রূপান্তরিত শিলা বলে (যেমন- মার্বেল, স্লেট)।
2. পাললিক শিলা কীভাবে সৃষ্টি হয়? এই শিলার প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো। (2+3=5)
উত্তর দেখো
দীর্ঘকাল ধরে নদী, বৃষ্টিপাত, বাতাস বা হিমবাহের আঘাতে পৃথিবীর পৃষ্ঠের কঠিন শিলা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়। এই পাথরকুচি, বালি, কাদা জলের স্রোতে বা বাতাসে পরিবাহিত হয়ে সমুদ্র বা হ্রদের তলদেশে স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয়। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জমা হওয়া এই পলির ওপরের স্তরের প্রবল চাপে এবং ভূগর্ভের তাপে নীচের পলিস্তরগুলি জমাট বেঁধে পাললিক শিলা তৈরি করে।
পাললিক শিলার প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য:
- স্তরায়ন (Stratification): সমুদ্র বা হ্রদের তলদেশে পলি একবারে জমা হয় না, বরং বছরের পর বছর ধরে একটি স্তরের ওপর আরেকটি স্তর হিসেবে জমা হয়। তাই এই শিলায় আলাদা আলাদা স্তর অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যাকে স্তরায়ন বলে।
- জীবাশ্মের উপস্থিতি (Fossils): পলি জমা হওয়ার সময় অনেক জলজ প্রাণী বা উদ্ভিদের মৃতদেহ পলির দুটি স্তরের মাঝখানে চাপা পড়ে যায়। লক্ষ লক্ষ বছর পর শিলা কঠিন হলে সেই মৃতদেহগুলি পাথরের গায়ে জীবাশ্ম হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। একমাত্র পাললিক শিলাতেই জীবাশ্ম দেখা যায়।
- কাঠিন্য ও সচ্ছিদ্রতা: এই শিলা আগ্নেয় বা রূপান্তরিত শিলার তুলনায় অনেক নরম ও হালকা হয়। এই শিলায় অসংখ্য সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকে, যার ফলে এই শিলাস্তর খুব সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং এর মধ্যে জল প্রবেশ করতে পারে।
3. চিত্রসহ ‘শিলাচক্র’ (Rock Cycle)-এর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি বর্ণনা করো। (5)
উত্তর দেখো
শিলাচক্রের প্রক্রিয়া (বর্ণনা):
- ম্যাগমা থেকে আগ্নেয় শিলা: প্রথমে ভূগর্ভের অত্যন্ত উত্তপ্ত ও গলিত ম্যাগমা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে বা ভূগর্ভেই ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে ‘আগ্নেয় শিলা’ তৈরি করে।
- আগ্নেয় শিলা থেকে পাললিক শিলা: দীর্ঘকাল ধরে রোদ, বৃষ্টি, নদী বা বাতাসের প্রভাবে কঠিন আগ্নেয় শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে টুকরো টুকরো পলি বা কাদায় পরিণত হয়। সেই পলি সমুদ্র বা হ্রদের তলদেশে বছরের পর বছর ধরে স্তরে স্তরে জমা হয়ে এবং প্রবল চাপে জমাট বেঁধে ‘পাললিক শিলা’ তৈরি করে।
- রূপান্তরিত শিলার সৃষ্টি: ভূগর্ভের প্রচণ্ড তাপ এবং ওপরের শিলাস্তরের প্রবল চাপের ফলে প্রাচীন আগ্নেয় শিলা এবং পাললিক শিলা—উভয়ই তাদের নিজস্ব রূপ ও গুণাবলি পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ নতুন ও কঠিন ‘রূপান্তরিত শিলা’-য় পরিণত হয়।
- পুনরায় ম্যাগমা সৃষ্টি: পাত সঞ্চালনের ফলে বা ভূমিকম্পের কারণে এই রূপান্তরিত শিলা (বা আগ্নেয় ও পাললিক শিলা) যখন ভূগর্ভের আরও গভীরে প্রবেশ করে, তখন সেখানকার অত্যধিক তাপে তা গলে গিয়ে পুনরায় ‘ম্যাগমা’-য় পরিণত হয়।
পরবর্তীতে এই ম্যাগমা আবার ঠান্ডা হয়ে আগ্নেয় শিলা তৈরি করে এবং এই চক্রাকার প্রক্রিয়াটি অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে।
4. ছকের সাহায্যে আগ্নেয়, পাললিক এবং রূপান্তরিত শিলার মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
| তুলনার বিষয় | আগ্নেয় শিলা | পাললিক শিলা | রূপান্তরিত শিলা |
|---|---|---|---|
| উৎপত্তি | ভূগর্ভের উত্তপ্ত ও গলিত ম্যাগমা শীতল ও কঠিন হয়ে সৃষ্টি হয়। | পলি বা কাদা বছরের পর বছর ধরে স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয়ে সৃষ্টি হয়। | ভূগর্ভের প্রচণ্ড তাপ ও চাপে আগের শিলার রূপ বদলে গিয়ে সৃষ্টি হয়। |
| স্তরায়ন | এই শিলায় কোনো স্তরভেদ বা স্তরায়ন থাকে না। | এই শিলায় আলাদা আলাদা স্তর বা স্তরায়ন স্পষ্টভাবে দেখা যায়। | সাধারণত এই শিলায় কোনো স্তরায়ন থাকে না (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)। |
| জীবাশ্ম (Fossils) | উত্তপ্ত ম্যাগমা থেকে তৈরি হয় বলে এতে জীবাশ্ম থাকে না। | একমাত্র এই শিলাতেই প্রাণী বা উদ্ভিদের জীবাশ্ম দেখা যায়। | অত্যাধিক তাপে ও চাপে তৈরি হয় বলে এতেও জীবাশ্ম থাকে না। |
| কাঠিন্য | অত্যন্ত কঠিন ও মজবুত হয়, সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। | নরম ও সচ্ছিদ্র হয়, তাই খুব সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। | আগের মূল শিলার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন ও ভারী হয়ে যায়। |
| উদাহরণ | ব্যাসল্ট, গ্রানাইট, পিউমিস। | বেলেপাথর, চুনাপাথর, কাদা পাথর। | মার্বেল, স্লেট, কোয়ার্টজাইট। |
5. রূপান্তরিত শিলার দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে শিলা ও খনিজের তিনটি প্রধান ব্যবহার আলোচনা করো। (2+3=5)
উত্তর দেখো
- কাঠিন্য বৃদ্ধি: রূপান্তরের ফলে শিলার ভেতরের খনিজগুলির গঠন একেবারে বদলে যায়, তাই রূপান্তরিত শিলা আগের মূল শিলার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন, ভারী ও মজবুত হয়ে যায়।
- জীবাশ্মের অভাব: এই শিলা অত্যাধিক তাপে ও চাপে তৈরি হয় বলে এতে কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণীর জীবাশ্ম বা ফসিল অবশিষ্ট থাকে না।
শিলা ও খনিজের প্রধান তিনটি ব্যবহার:
- নির্মাণকাজ: আমাদের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, রেললাইন এবং বড়ো বড়ো সেতু বা বাঁধ তৈরির প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যাসল্ট, গ্রানাইট, বেলেপাথর ও চুনাপাথর ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া মার্বেল পাথর দিয়ে সুন্দর মূর্তি ও সৌধ (যেমন- তাজমহল) তৈরি হয়।
- জ্বালানির উৎস: পাললিক শিলার স্তর থেকেই আমরা কয়লা এবং খনিজ তেল (পেট্রোলিয়াম)-এর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম জ্বালানি পাই। এই খনিজ তেল থেকে পাওয়া পেট্রোল ও ডিজেল আমাদের সমস্ত যানবাহন ও শিল্পকে সচল রাখে।
- শিল্পের কাঁচামাল: লোহা ও ইস্পাত শিল্পে এবং সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল হিসেবে চুনাপাথর ও ডলোমাইট শিলা অপরিহার্য। এছাড়া স্লেট পাথর ব্ল্যাকবোর্ড তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।