অষ্টম শ্রেণী: ভূগোল, অধ্যায় – 4, চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5
অধ্যায় 4: চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. পৃথিবীর প্রধান স্থায়ী বায়ুচাপ বলয়গুলির নাম লেখো। নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় এবং মেরু উচ্চচাপ বলয় সৃষ্টির কারণগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো। (2+3=5)
উত্তর দেখো
নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় সৃষ্টির কারণ:
- সূর্যরশ্মির পতন: নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারা বছর সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় বায়ু অত্যন্ত উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়।
- জলীয় বাষ্প: এই অঞ্চলে জলভাগের পরিমাণ বেশি থাকায় বাতাসে প্রচুর জলীয় বাষ্প মেশে, যা সাধারণ বায়ুর চেয়ে হালকা।
- আবর্তন বেগ: পৃথিবীর মাঝখানে আবর্তন বেগ সবচেয়ে বেশি হওয়ায় বায়ু দুই মেরুর দিকে ছিটকে যায়, ফলে এখানে বায়ুর ঘনত্ব ও চাপ কমে গিয়ে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়।
মেরু উচ্চচাপ বলয় (সুমেরু ও কুমেরু) সৃষ্টির কারণ:
- প্রবল শৈত্য: দুই মেরু অঞ্চলে সূর্যরশ্মি সারা বছর অত্যন্ত তির্যকভাবে পড়ে, তাই সেখানে প্রবল ঠান্ডা থাকে এবং ভূমি বরফে ঢাকা থাকে। এই অত্যাধিক ঠান্ডায় বাতাস সংকুচিত, শীতল ও ভারী হয়ে যায়।
- জলীয় বাষ্পের অভাব: উষ্ণতা হিমাঙ্কের নীচে থাকায় এখানকার বাতাসে জলীয় বাষ্প প্রায় থাকে না বললেই চলে। শুষ্ক ও শীতল বায়ু অত্যন্ত ভারী হওয়ায় এখানে সারা বছর স্থায়ী উচ্চচাপ বিরাজ করে।
2. নিয়ত বায়ু কাকে বলে? পৃথিবীর বায়ুচাপ বলয়গুলির সাথে তিন প্রকার নিয়ত বায়ুপ্রবাহের সম্পর্ক চিত্রসহ আলোচনা করো। (1+4=5)
উত্তর দেখো
1. আয়ন বায়ু ও বায়ুচাপ বলয়:
- কর্কটীয় এবং মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে সারা বছর ধরে এই বায়ু প্রবাহিত হয়।
- ফেরেলের সূত্র মেনে উত্তর গোলার্ধে এটি ‘উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু’ এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ‘দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু’ নামে প্রবাহিত হয়।
2. পশ্চিমা বায়ু ও বায়ুচাপ বলয়:
- কর্কটীয় এবং মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে যথাক্রমে সুমেরুবৃত্ত এবং কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে এই বায়ু প্রবাহিত হয়।
- এটি উত্তর গোলার্ধে ‘দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু’ এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ‘উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু’ রূপে প্রবাহিত হয়। দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি হওয়ায় এই বায়ু প্রবল বেগে বয়।
3. মেরু বায়ু ও বায়ুচাপ বলয়:
- সুমেরু এবং কুমেরু উচ্চচাপ বলয় থেকে অত্যন্ত শীতল ও ভারী বায়ু যথাক্রমে সুমেরুবৃত্ত এবং কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হয়।
- এটি উত্তর গোলার্ধে ‘উত্তর-পূর্ব মেরু বায়ু’ এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ‘দক্ষিণ-পূর্ব মেরু বায়ু’ নামে বয়ে যায়।
3. সমুদ্র বায়ু ও স্থল বায়ু কীভাবে সৃষ্টি হয় তা চিত্রসহ ব্যাখ্যা করো এবং এদের মধ্যে প্রধান দুটি পার্থক্য লেখো। (3+2=5)
উত্তর দেখো
- দিনের বেলায় সূর্যের তাপে সমুদ্রের জলের তুলনায় উপকূলের স্থলভাগ অনেক দ্রুত গরম হয়ে যায়। ফলে স্থলভাগের ওপরের বায়ু উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায় এবং সেখানে একটি গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়।
- অন্যদিকে, সমুদ্রের জল তখন তুলনামূলকভাবে শীতল থাকায় সেখানে উচ্চচাপ বিরাজ করে। তাই বায়ুর চাপের সমতা ফেরাতে দিনের বেলায় সমুদ্রের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে শীতল ও আর্দ্র বায়ু স্থলভাগের দিকে ছুটে আসে, একেই সমুদ্র বায়ু বলে।
স্থল বায়ুর সৃষ্টি:
- রাতের বেলায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টে যায়। সূর্যাস্তের পর স্থলভাগ সমুদ্রের তুলনায় অনেক দ্রুত তাপ বিকিরণ করে ঠান্ডা হয়ে যায়। ফলে স্থলভাগে উচ্চচাপের সৃষ্টি হয়।
- অন্যদিকে, সমুদ্রের জল তখন তুলনামূলকভাবে উষ্ণ থাকায় সেখানে নিম্নচাপ বিরাজ করে। তাই রাতের বেলায় স্থলভাগের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে শুষ্ক বায়ু সমুদ্রের দিকে ছুটে যায়, একেই স্থল বায়ু বলে।
পার্থক্য:
- প্রবাহের সময় ও দিক: সমুদ্র বায়ু দিনের বেলায় সমুদ্র থেকে স্থলের দিকে বয়। কিন্তু স্থল বায়ু রাতের বেলায় স্থল থেকে সমুদ্রের দিকে বয়।
- প্রকৃতি: জলভাগের ওপর দিয়ে আসে বলে সমুদ্র বায়ু আর্দ্র ও শীতল হয় এবং বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে। অন্যদিকে স্থল বায়ু স্থলভাগের ওপর দিয়ে আসে বলে তা শুষ্ক হয়।
4. মৌসুমী বায়ু কাকে বলে? ভারতের জলবায়ুর ওপর গ্রীষ্মকালীন এবং শীতকালীন মৌসুমী বায়ুর প্রভাব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করো। (1+4=5)
উত্তর দেখো
ভারতের জলবায়ুতে মৌসুমী বায়ুর প্রভাব:
- গ্রীষ্মকালীন মৌসুমী বায়ুর প্রভাব:
- গ্রীষ্মকালে ভারতের স্থলভাগ অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি করে। তখন দক্ষিণ দিকের বিশাল ভারত মহাসাগরের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে বাতাস ভারতের দিকে ছুটে আসে, একে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু বলে।
- এই বায়ু দীর্ঘ সমুদ্রপথ অতিক্রম করে আসে বলে এতে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প থাকে। ভারতের পাহাড়-পর্বতে (বিশেষত পশ্চিমঘাট পর্বত ও মেঘালয়ে) বাধা পেয়ে এই বায়ু সারা দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, যা ভারতের কৃষিকাজ ও অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
- শীতকালীন মৌসুমী বায়ুর প্রভাব:
- শীতকালে ভারতের স্থলভাগ অত্যন্ত শীতল হয়ে উচ্চচাপের সৃষ্টি করে। তখন স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে বায়ু প্রবাহিত হয়, একে উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু বলে।
- এই বায়ু স্থলভাগের ওপর দিয়ে আসে বলে এটি অত্যন্ত শুষ্ক ও শীতল হয়। তাই শীতকালে এই বায়ুর প্রভাবে ভারতে বৃষ্টিপাত প্রায় হয় না বললেই চলে এবং আবহাওয়া অত্যন্ত শীতল ও শুষ্ক থাকে।
5. ছকের সাহায্যে ঘূর্ণিঝড় এবং প্রতীপ ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে পাঁচটি মূল পার্থক্য আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
| তুলনার বিষয় | ঘূর্ণিঝড় | প্রতীপ ঘূর্ণিঝড় |
|---|---|---|
| বায়ুর চাপ | এর কেন্দ্রে সর্বদা গভীর নিম্নচাপ এবং বাইরে উচ্চচাপ থাকে। | এর কেন্দ্রে সর্বদা শক্তিশালী উচ্চচাপ এবং বাইরে নিম্নচাপ থাকে। |
| বায়ুর গতিবিধি | বায়ু বাইরের দিক থেকে সর্পিলাকারে প্রবল বেগে কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে (অন্তর্মুখী প্রবাহ)। | বায়ু কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে সর্পিলাকারে মৃদু বেগে বেরিয়ে যায় (বহির্মুখী প্রবাহ)। |
| আবহাওয়া | আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে যায় এবং প্রবল ঝড়বৃষ্টির সাথে ধ্বংসলীলা চলে। | আকাশ সম্পূর্ণ মেঘমুক্ত থাকে এবং অত্যন্ত শান্ত ও রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া বিরাজ করে। |
| স্থায়িত্ব ও আকার | এগুলি সাধারণত অল্প জায়গা জুড়ে সৃষ্টি হয় এবং খুব কম সময় স্থায়ী হয়। | এগুলি বিশাল অঞ্চল জুড়ে সৃষ্টি হয় এবং অনেক দিন ধরে স্থায়ী হয়। |
| ধ্বংস ক্ষমতা | এর গতিবেগ সাংঘাতিক বেশি হওয়ায় এটি অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক প্রকৃতির হয়। | বায়ুর গতিবেগ খুব ধীর হওয়ায় এটি কোনো ক্ষতি বা ধ্বংসলীলা চালায় না। |
6. স্থানীয় বায়ু বলতে কী বোঝো? পৃথিবীর তিনটি উল্লেখযোগ্য স্থানীয় বায়ুর (লু, চিনুক, মিস্ট্রাল) উদাহরণসহ সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। (2+3=5)
উত্তর দেখো
তিনটি উল্লেখযোগ্য স্থানীয় বায়ুর পরিচয়:
- লু: এটি একটি অত্যন্ত উষ্ণ এবং শুষ্ক স্থানীয় বায়ু। গ্রীষ্মকালে দিনের বেলায় ভারতের উত্তর-পশ্চিমাংশে (রাজস্থান, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ) এটি প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়। এর প্রভাবে বায়ুর উষ্ণতা এতটাই বেড়ে যায় যে, প্রবল গরমে বহু মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।
- চিনুক: উত্তর আমেরিকার রকি পর্বতের পূর্ব ঢাল বেয়ে প্রেইরি সমভূমির দিকে নেমে আসা একটি উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ু হলো চিনুক। এই বায়ু প্রবাহিত হওয়ার সময় এর উত্তাপে পাহাড়ের জমে থাকা বরফ খুব দ্রুত গলে যায় বলে স্থানীয় অধিবাসীরা একে ‘তুষারভক্ষক’ বলে থাকেন।
- মিস্ট্রাল: এটি একটি অত্যন্ত শীতল এবং শুষ্ক স্থানীয় বায়ু। শীতকালে ফ্রান্সের রোন নদীর উপত্যকা ধরে ভূমধ্যসাগরের দিকে এই বায়ু প্রবাহিত হয়। এর প্রভাবে ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নেমে যায় এবং প্রবল শীতের প্রকোপ দেখা দেয়।