অষ্টম শ্রেণী: বাংলা, অধ্যায় – 1 বোঝাপড়া – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২

অধ্যায় 1: বোঝাপড়া
(সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – মান: 2)

নিচের প্রশ্নগুলির দু-তিনটি বাক্যে উত্তর দাও:

1. “মনেরে আজ কহ যে, / ভালো মন্দ যাহাই আসুক, / সত্যেরে লও সহজে।” – কবি কোন সত্যকে সহজে নিতে বলেছেন এবং কেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: এই পৃথিবীতে সবাই আমাদের ভালোবাসবে না, কেউ স্বার্থান্ধ হবে আবার কেউ নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়াবে। মানবজীবনের এই রূঢ় কিন্তু চিরন্তন বাস্তব সত্যকেই কবি সহজে বা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে বলেছেন। কারণ, এই কঠিন সত্যকে হাসিমুখে মেনে নিতে পারলেই জীবনে প্রকৃত শান্তি ও স্বস্তি নেমে আসে।

2. “কতকটা যে স্বভাব তাদের, কতকটা বা তোমারও ভাই” – কাদের স্বভাবের কথা বলা হয়েছে? লাইনটির তাৎপর্য কী?

উত্তর দেখো

উত্তর: এখানে সমাজের সেইসব স্বার্থপর মানুষের স্বভাবের কথা বলা হয়েছে, যারা আমাদের ভালোবাসে না বা আমাদের সাথে ছলনা করে। এর তাৎপর্য হলো, পৃথিবীতে সব মানুষ সমান নয়; কেউ আমাদের ঠকায়, আবার আমরাও কখনো কখনো পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্যদের ফাঁকি দিই— এটিই মানবচরিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

3. “অনেক ঝঞ্ঝা কাটিয়ে বুঝি / এলে সুখের বন্দরেতে।” – ‘ঝঞ্ঝা’ ও ‘সুখের বন্দর’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: ‘ঝঞ্ঝা’ বলতে এখানে জীবনের চরম বাধাবিপত্তি, সীমাহীন দুঃখ বা প্রতিকূল পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়েছে। অন্যদিকে, ‘সুখের বন্দর’ হলো জীবনের সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তিময় ও স্বস্তিদায়ক অবস্থা, যা মানুষ বহু কষ্ট, সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করার পর অর্জন করতে সক্ষম হয়।

4. “জলের তলে পাহাড় ছিল, / লাগল বুকের অন্দরেতে।” – এই পঙ্‌ক্তিটির অন্তর্নিহিত অর্থ কী?

উত্তর দেখো

উত্তর: সমুদ্রের গভীর জলে লুকিয়ে থাকা পাহাড় যেমন অপ্রত্যাশিতভাবে ভয়াবহ জাহাজডুবি ঘটায়, তেমনি মানুষের জীবনেও এমন কিছু আচমকা বিপদ বা প্রিয়জনের বিশ্বাসঘাতকতা আসে, যার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত থাকে না। এই চরম ও অতর্কিত আঘাত মানুষের মর্মমূলে বা বুকের গভীরে তীব্র ক্ষতের সৃষ্টি করে।

5. “শঙ্কা যেথায় করে না কেউ / সেইখানে হয় জাহাজ-ডুবি।” – উদ্ধৃতাংশটির মাধ্যমে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: মানুষ সাধারণত তার জানা বিপদগুলি সম্পর্কে সর্বদা সতর্ক থাকে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড়ো আঘাত বা বিপর্যয়গুলি অনেক সময় সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে এবং এমন ভরসার জায়গা থেকে আসে, যেখান থেকে মানুষ বিন্দুমাত্র বিপদের বা প্রতারণার আশঙ্কা করে না।

6. “তাই বলে কি আলগোছে বুক / ভাসিয়ে দিয়ে কাঁদবে নাকি?” – কবির এমন প্রশ্নের কারণ কী?

উত্তর দেখো

উত্তর: অপ্রত্যাশিত বিপদে বা প্রিয়জনের নিদারুণ আঘাতে মানুষ অনেক সময় গভীরভাবে হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয় এবং ভাগ্যের দোহাই দিয়ে হা-হুতাশ করে। কবি মনে করেন, পরিস্থিতির কাছে এভাবে আত্মসমর্পণ করা বা দুর্বলতা প্রকাশ করা কাপুরুষতার লক্ষণ, তাই মানুষের অন্তরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতেই তিনি এই প্রশ্নটি করেছেন।

7. “ডুবতে হয় তো ভাসতে পারো / সেইটে সবার চেয়ে শ্রেয়।” – ডুবতে হলেও ভাসতে পারাকে কবি ‘শ্রেয়’ বলেছেন কেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: জীবনে চরম বিপর্যয় বা দুঃখের সাগরে নিমজ্জিত হওয়ার পরিস্থিতি এলেও একেবারে হাল ছেড়ে দিয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। বরং অদম্য মনের জোর নিয়ে সেই বিপদের মোকাবিলা করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করাকেই কবি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বা ‘শ্রেয়’ বলে মনে করেছেন।

8. “দোহাই তবে এ কার্যটা / যত শীঘ্র পারো সারো।” – ‘এ কার্যটা’ বলতে কোন কাজের কথা বলা হয়েছে? কেন তা শীঘ্র সারতে বলা হয়েছে?

উত্তর দেখো

উত্তর: ‘এ কার্যটা’ বলতে মনের গভীরে জমে থাকা দুঃখ, হতাশা বা আক্ষেপকে কান্নার মাধ্যমে প্রকাশ করে মনকে সম্পূর্ণ হালকা করে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কারণ, মনের ভার মুক্ত হলে তবেই মানুষ নতুন উদ্যমে জীবনের চরম সত্যের সাথে বোঝাপড়া করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

9. “খুব খানিকটে কেঁদে কেটে / অশ্রু ঢেলে ঘড়া ঘড়া” – কবির এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে মানুষের কোন মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছে?

উত্তর দেখো

উত্তর: সাধারণ মানুষ জীবনে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ বা দুঃখে পড়লে সাময়িকভাবে ভেঙে পড়ে এবং প্রচুর কান্নাকাটি করে মনের ভার লাঘব করার চেষ্টা করে। কবির এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে মানবমনের এই অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যেরই সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে।

10. “মনের সঙ্গে একরকমে / করে নে ভাই বোঝাপড়া।” – মনের সঙ্গে কী রূপ বোঝাপড়া করার কথা বলা হয়েছে?

উত্তর দেখো

উত্তর: জীবনে ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ বা লাভ-ক্ষতি যাই আসুক না কেন, তাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মেনে নেওয়াই হলো মনের সাথে বোঝাপড়া। অকারণে হাহাকার না করে বা ভাগ্যের দোষ না দিয়ে এই রূঢ় বাস্তবকে হাসিমুখে ও দ্বিধাহীনভাবে গ্রহণ করার কথাই এখানে অত্যন্ত গভীরভাবে বলা হয়েছে।

11. “তাহার পরে আঁধার ঘরে / প্রদীপখানি জ্বালিয়ে তোলো।” – ‘আঁধার ঘর’ এবং ‘প্রদীপ জ্বালানো’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: ‘আঁধার ঘর’ বলতে অপ্রত্যাশিত আঘাতে বা চরম ব্যর্থতায় নিমজ্জিত অন্ধকারাচ্ছন্ন ও হতাশ মনকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘প্রদীপ জ্বালানো’ বলতে সেই হতাশা কাটিয়ে উঠে মনের ভেতর নতুন করে আশা, আত্মবিশ্বাস এবং ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে জাগ্রত করার কথা বলা হয়েছে।

12. “ভুলে যা ভাই, কাহার সঙ্গে / কতটুকুন তফাত হলো।” – ‘তফাত’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? কেন তা ভুলে যেতে বলা হয়েছে?

উত্তর দেখো

উত্তর: ‘তফাত’ বলতে এখানে মানুষে মানুষে মতের অমিল, স্বার্থের সংঘাত বা চাওয়া-পাওয়ার হিসেবের পার্থক্যকে বোঝানো হয়েছে। এই সামান্য ব্যবধান বা দ্বন্দ্ব নিয়ে মনে অহংকার বা ক্ষোভ পুষে রাখলে নিজেদেরই অকারণ কষ্ট বাড়ে, তাই বৃহত্তর শান্তির স্বার্থে কবি এসব তুচ্ছ বিষয় ভুলে যেতে বলেছেন।

13. “বিশ্বজগত চলবে না তো / তোমার সঙ্গে আড়ি করে।” – পঙ্‌ক্তিটির অন্তর্নিহিত অর্থ কী?

উত্তর দেখো

উত্তর: এই বিশাল পৃথিবীর নিজস্ব এক চিরন্তন নিয়ম ও গতি রয়েছে। কোনো মানুষের ব্যক্তিগত দুঃখ, হতাশা, অভিমান বা কারও সাথে বিবাদের কারণে এই বিশ্বজগতের স্বাভাবিক নিয়ম বা চলা কখনোই থেমে থাকে না, সে তার আপন ছন্দেই সামনের দিকে এগিয়ে চলে।

14. “অকারণে হা হা করে / আকাশটাতে ফাটল ধরানো” – বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: অপ্রত্যাশিত বিপদে বা সামান্য ক্ষতিতে অধৈর্য হয়ে প্রবল চিৎকার বা হাহাকার করে পরিবেশ অশান্ত করাকে বোঝানো হয়েছে। কবি মনে করেন, এইভাবে বৃথা আক্ষেপ করে আকাশ-বাতাস কাঁপানো সম্পূর্ণ অর্থহীন, কারণ তাতে কোনো সমস্যারই সমাধান হয় না।

15. “বিধির সাথে বিবাদ করে / নিজের পায়ে কুড়ুল মারো।” – ‘বিধির সাথে বিবাদ’ এবং ‘নিজের পায়ে কুড়ুল মারা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

উত্তর দেখো

উত্তর: বোকামি বা রাগের বশে অকারণে ভাগ্য বা ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে হা-হুতাশ করাকেই ‘বিধির সাথে বিবাদ’ বলা হয়েছে। এর ফলে মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজেরই চরম ক্ষতি বা বিপদ ডেকে আনে, যা ‘নিজের পায়ে কুড়ুল মারা’-র সমতুল্য।

16. “তোমার মাপে হয়নি সবাই, / তুমিও হওনি সবার মাপে” – এর মাধ্যমে মানুষের কোন মানসিকতার সমালোচনা করা হয়েছে?

উত্তর দেখো

উত্তর: মানুষ প্রায়শই আশা করে যে অন্যেরা ঠিক তার মনের মতো আচরণ করবে এবং তা না হলেই সে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি মানুষের স্বভাব ও চিন্তাধারা সম্পূর্ণ আলাদা; তাই অন্যের ওপর নিজের ইচ্ছে চাপিয়ে দেওয়ার এই স্বার্থপর মানসিকতাকেই কবি এখানে সমালোচনা করেছেন।

17. “তুমিও কতক দেবে ফাঁকি।” – মানুষ কখন বা কেন অন্যকে ফাঁকি দেয় বলে কবি মনে করেছেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: পৃথিবীতে কেউ যেমন সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ হতে পারে না, তেমনি মানুষও অনেক সময় নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বা পরিস্থিতির চাপে পড়ে অন্যদের সাথে প্রতারণা করে বা ফাঁকি দেয়। এটি মানবচরিত্রের এক অত্যন্ত রূঢ় কিন্তু সাধারণ বৈশিষ্ট্য, যা থেকে কেউই সম্পূর্ণ মুক্ত নয়।

18. “কেউ বিকিয়ে আছে, কেউ বা / সিকি পয়সা ধারে না যে” – উদ্ধৃতিটির মাধ্যমে সমাজের কোন বৈচিত্র্যের কথা বলা হয়েছে?

উত্তর দেখো

উত্তর: সমাজে নানা ধরনের মানুষের বাস। কেউ হয়তো ভালোবেসে অন্যের জন্য নিজের সর্বস্ব নিঃস্বার্থভাবে ত্যাগ করে, আবার কেউ এতটাই স্বার্থপর যে সে অন্যের সামান্যতম উপকারেও আসে না বা কাউকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করে না— সমাজের এই চরম বৈপরীত্যই এখানে ফুটে উঠেছে।

19. “ভালো মন্দ যাহাই আসুক, / সত্যেরে লও সহজে।” – এই পঙ্‌ক্তিটিকে কবিতার মূলমন্ত্র বলা যায় কেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: মানবজীবন কখনোই মসৃণ নয়, এখানে আলো-অন্ধকার, সুখ-দুঃখ এবং লাভ-ক্ষতি পাশাপাশি অবস্থান করে। এই দ্বান্দ্বিক রূপকে মেনে নিয়ে, ভাগ্যের দোহাই না দিয়ে বাস্তবকে হাসিমুখে গ্রহণ করাই হলো জীবনের সবচেয়ে বড়ো ধর্ম, তাই এটিকেই সমগ্র কবিতার মূলমন্ত্র বলা যায়।

20. ‘বোঝাপড়া’ কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের চরম হতাশা থেকে মুক্তির কী উপায় বলে দিয়েছেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: কবির মতে, অপ্রত্যাশিত আঘাত পেলে সাময়িক কান্নাকাটি করে মনের ভার হালকা করে নেওয়া উচিত। এরপর ভাগ্যের দোষ না দিয়ে, অন্যের সাথে দ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে নিজের মনের সাথে সঠিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে নতুন আশায় বুক বেঁধে এগিয়ে চলাই হলো হতাশা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার