অষ্টম শ্রেণী: বাংলা, অধ্যায় – 2 অদ্ভুত আতিথেয়তা -ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5

অধ্যায় 2: অদ্ভুত আতিথেয়তা
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্প অবলম্বনে আরব সেনাপতির চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্পের মূল আকর্ষণ এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন আরব সেনাপতি। তাঁর চরিত্রের মধ্যে যে মহৎ গুণাবলির প্রকাশ ঘটেছে, তা নিচে আলোচনা করা হলো:

  • আতিথ্য পরায়ণতা: আরব সেনাপতি আতিথ্য ধর্মের এক মূর্ত প্রতীক। চরম শত্রু মূর সেনাপতি দিকভ্রান্ত হয়ে তাঁর শিবিরে এলে, তিনি শত্রুর পরিচয় ভুলে গিয়ে পরম যত্নে তাঁর আহার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন।
  • অসীম আত্মনিয়ন্ত্রণ: কথোপকথনের মাঝে আরব সেনাপতি বুঝতে পারেন যে আশ্রিত অতিথিই তাঁর পিতার হত্যাকারী। পিতার হত্যাকারীকে হাতের মুঠোয় পেয়েও তিনি অতিথির কোনো ক্ষতি করেননি। নিজের প্রবল ক্রোধ ও প্রতিশোধ স্পৃহাকে তিনি অদ্ভুত মানসিক দৃঢ়তার সাথে দমন করেছিলেন।
  • কর্তব্যপরায়ণতা ও মহানুভবতা: তিনি কেবল আতিথ্য ধর্মই পালন করেননি, শত্রুকে নিরাপদে পালানোর জন্য একটি দ্রুতগামী ঘোড়া দিয়ে সাহায্যও করেছেন। আবার সূর্যোদয়ের পর আতিথ্য ধর্মের মেয়াদ শেষ হলে, পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তিনি শত্রুর পিছুও ধাওয়া করেছেন। অর্থাৎ, অতিথি সেবার পাশাপাশি পুত্র হিসেবে পিতার প্রতি কর্তব্য— উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অবিচল।

পরিশেষে বলা যায়, চরম প্রতিশোধ স্পৃহার ঊর্ধ্বে উঠে আতিথ্য ধর্মকে সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে আরব সেনাপতির চরিত্রটি এক মহান ও আদর্শ চরিত্রে পরিণত হয়েছে।

2. “আতিথেয়তা বিষয়ে পৃথিবীতে কোনো জাতি আরবদিগের তুল্য নহে।” – ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্প অবলম্বনে এই উক্তিটির সত্যতা বিচার করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্পের শুরুতেই আরব জাতির আতিথেয়তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। গল্পে আরব সেনাপতির আচরণের মধ্য দিয়েই এই উক্তিটির নিখুঁত সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে।

আরবদের নিয়ম হলো, কোনো ব্যক্তি অতিথি হিসেবে তাদের বাড়িতে আশ্রয় নিলে, তিনি যদি চরম শত্রুও হন, তবু তারা প্রাণান্তেও তাঁর কোনো ক্ষতি করে না। গল্পে আমরা দেখি, যুদ্ধে পরাজিত, ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত বিপক্ষ দলের এক মূর সেনাপতি প্রাণরক্ষার জন্য আরব সেনাপতির তাঁবুতে আশ্রয় নেন। আরব সেনাপতি তাঁকে শত্রুপক্ষের লোক জেনেও বিন্দুমাত্র অবজ্ঞা না করে পরম যত্নে তাঁর সেবা করেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটে রাতে। আরব সেনাপতি জানতে পারেন যে এই আশ্রিত মূর সেনাপতিই তাঁর পিতার হত্যাকারী। পিতৃহন্তাকে সামনে পেয়েও শুধুমাত্র আতিথ্য ধর্মের কারণে তিনি নিজের প্রতিশোধ স্পৃহাকে দমন করেন। শুধু তাই নয়, সকালে সেই শত্রুকে নির্বিঘ্নে পালানোর জন্য তিনি একটি তেজস্বী ঘোড়াও দান করেন। চরম শত্রুর প্রতি এই অভাবনীয় ও অদ্ভুত আতিথেয়তা সত্যিই পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তাই লেখকের এই উক্তিটি আক্ষরিক অর্থেই সম্পূর্ণ সত্য ও সার্থক।

3. ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্পটির নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি সার্থক নামকরণ রচনার মূল ভাব বা বিষয়বস্তুকে পাঠকের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত আলোচ্য গল্পটির ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ নামকরণটি বিষয়বস্তুর দিক থেকে সম্পূর্ণ সার্থক।

সাধারণত মানুষ বাড়িতে আসা আত্মীয় বা পরিচিত অতিথির সেবা যত্ন করে থাকে, এটাই স্বাভাবিক আতিথেয়তা। কিন্তু আলোচ্য গল্পে আতিথেয়তার যে রূপ প্রকাশ পেয়েছে, তা সত্যিই ‘অদ্ভুত’ বা বিস্ময়কর। এই গল্পে দিকভ্রান্ত হয়ে আশ্রয় নেওয়া এক চরম শত্রু তথা পিতার হত্যাকারীকে পরম যত্নে সেবা করার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এক আরব সেনাপতি।

পিতৃহন্তাকে হাতের মুঠোয় পেয়েও তাকে হত্যা না করে, তার আহার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করা এবং পরিশেষে তাকে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ঘোড়া দিয়ে সাহায্য করা— মানব ইতিহাসে আতিথেয়তার এমন দৃষ্টান্ত সত্যিই অভাবনীয়। যেহেতু সমগ্র গল্পের মূল উপজীব্য বিষয় হলো আরব সেনাপতির এই বিস্ময়কর ও অভাবনীয় আতিথ্য ধর্ম, তাই ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও শিল্পোত্তীর্ণ হয়েছে।

4. “আমাদের উভয় জাতির যে বৈরভাব আছে, আমি তোমা অপেক্ষা তাহার উত্তম প্রমাণ দিতেছি না।” – বক্তা কে? তিনি কোন্ বৈরভাবের উত্তম প্রমাণের কথা এখানে বলেছেন? (1+4=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

বক্তা: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্পে উদ্ধৃত কথাটির বক্তা হলেন আরব সেনাপতি।

উত্তম প্রমাণের তাৎপর্য: আরব এবং মূর জাতির মধ্যে বহুকাল ধরে রক্তক্ষয়ী শত্রুতা বা বৈরভাব চলে আসছিল। এই শত্রুতার বশবর্তী হয়েই মূর সেনাপতি একসময় আরব সেনাপতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন। মূর সেনাপতি তাঁর নিষ্ঠুরতা দিয়ে দুই জাতির শত্রুতার প্রমাণ রেখেছিলেন।

অন্যদিকে, আরব সেনাপতি তাঁর পিতৃহন্তাকে নিজের তাঁবুতে একাকী ও অসহায় অবস্থায় পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁকে হত্যা করেননি। আরবদের পবিত্র আতিথ্য ধর্ম পালন করে তিনি সেই চরম শত্রুকে প্রাণরক্ষার সুযোগ দেন এবং পালানোর জন্য একটি তেজস্বী ঘোড়া উপহার দেন। আরব সেনাপতি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মূর সেনাপতি নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে যে শত্রুতার প্রমাণ দিয়েছিলেন, তিনি প্রতিশোধ না নিয়ে এবং মহানুভবতা দেখিয়ে তার চেয়ে অনেক মহৎ এবং ‘উত্তম’ প্রমাণ স্থাপন করলেন। আতিথ্য ধর্মের জয়গানের মধ্য দিয়েই তিনি এই উত্তম প্রমাণটি দিয়েছেন।

5. আরব সেনাপতি পিতৃহন্তাকে হাতের মুঠোয় পেয়েও কেন প্রতিশোধ নিলেন না? তিনি কীভাবে আতিথ্য ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করলেন তা নিজের ভাষায় লেখো। (2+3=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

প্রতিশোধ না নেওয়ার কারণ: আরব সেনাপতি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া মূর সেনাপতিই তাঁর পিতার হত্যাকারী। কিন্তু আরবেরা আতিথেয়তার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। তাঁদের ধর্ম অনুযায়ী, আশ্রিত অতিথি চরম শত্রু হলেও তাঁর প্রাণহানি করা ঘোরতর পাপ। তাই নিজের পবিত্র আতিথ্য ধর্মকে কলঙ্কমুক্ত রাখতেই তিনি পিতৃহন্তাকে হাতের মুঠোয় পেয়েও রাতে প্রতিশোধ নেননি।

আতিথ্য ধর্মের মর্যাদা রক্ষা: আরব সেনাপতি অদ্ভুত আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আতিথ্য ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন। পিতার হত্যাকারীকে চেনার পর তাঁর মন প্রতিশোধের আগুনে জ্বললেও তিনি তা প্রকাশ হতে দেননি। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি সভা থেকে বিদায় নেন যাতে রাগের মাথায় অতিথির কোনো অসম্মান না হয়। শুধু তাই নয়, সকালে অতিথির পালানোর সুবিধার্থে তিনি একটি অত্যন্ত দ্রুতগামী ও তেজস্বী ঘোড়াও প্রস্তুত রাখেন। সূর্যোদয় পর্যন্ত অতিথির প্রাণ নিরাপদ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং তাঁকে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে তিনি আতিথ্য ধর্মের এক অভূতপূর্ব মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন।

6. মূর সেনাপতি কীভাবে আরব সেনাপতির শিবিরে উপস্থিত হয়েছিলেন? বিদায়কালে আরব সেনাপতি তাঁকে কী বলে সতর্ক করেছিলেন? (2+3=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

উপস্থিত হওয়ার প্রেক্ষাপট: আরব ও মূর জাতির মধ্যে এক ভয়ানক যুদ্ধ চলার সময়, বিপক্ষ দলের এক মূর সেনাপতি প্রাণভয়ে ঘোড়ায় চড়ে পালাতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। সারাদিন ঘোড়ায় চড়ে তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত, দিকভ্রান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েন। পরিশেষে আর উপায় না দেখে, নিরুপায় হয়ে তিনি ঘটনাক্রমে বিপক্ষ দলের এক আরব সেনাপতির শিবিরে এসে উপস্থিত হন এবং তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন।

বিদায়কালের সতর্কতা: প্রাতঃকালে বিদায় জানানোর সময় আরব সেনাপতি মূর সেনাপতিকে একটি কঠোর সত্যের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে, সূর্যোদয় হওয়ার সাথে সাথে আতিথ্য ধর্মের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে এবং তখন তিনি পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে মূর সেনাপতিকে হত্যা করার জন্য তাঁর পিছু ধাওয়া করবেন। আরব সেনাপতির নিজের ঘোড়াটি ছিল মূর সেনাপতিকে দেওয়া ঘোড়ার চেয়েও বেশি দ্রুতগামী। তাই তিনি মূর সেনাপতিকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, তিনি যেন বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে অত্যন্ত দ্রুতবেগে পালিয়ে যান, অন্যথায় আরব সেনাপতির হাত থেকে তাঁর প্রাণরক্ষা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার