অষ্টম শ্রেণী: বাংলা, অধ্যায় – 3: চন্দ্রগুপ্ত (নাটক) দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5
অধ্যায় 3: চন্দ্রগুপ্ত
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশ অবলম্বনে তরুণ চন্দ্রগুপ্তের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন মগধের নির্বাসিত রাজপুত্র তরুণ চন্দ্রগুপ্ত। তাঁর চরিত্রের যে মহৎ ও বীরত্বপূর্ণ দিকগুলি নাট্যাংশে ফুটে উঠেছে, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
- অসীম সাহসিকতা ও নির্ভীকতা: গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রিক সম্রাটের সামনে বন্দি অবস্থায় দাঁড়িয়েও চন্দ্রগুপ্ত বিন্দুমাত্র ভয় পাননি। তিনি অত্যন্ত নির্ভীকভাবে সেকেন্দারের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেছেন এবং পিছন থেকে আক্রমণ করার জন্য আন্তিগোনসকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছেন।
- স্পষ্টবাদিতা ও আত্মমর্যাদাবোধ: চন্দ্রগুপ্ত কোনো মিথ্যা কথা বলেননি। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে তিনি গুপ্তচর নন, বরং নিজের রাজ্য উদ্ধারের জন্য গ্রিকদের রণকৌশল শিখতে এসেছেন। সেকেন্দারের অভিযোগের উত্তরে তিনি দীপ্ত কণ্ঠে জানিয়েছেন যে, সম্রাটের যেমন তাঁর শিবিরে অধিকার, চন্দ্রগুপ্তেরও ঠিক তেমনই অধিকার।
- দেশপ্রেম ও লক্ষ্যস্থিরতা: সৎভাই নন্দরাজ তাঁকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিলেও তিনি দমে যাননি। মাতৃভূমিকে পুনরুদ্ধার করার অদম্য জেদ নিয়ে তিনি বিপদের ঝুঁকি নিয়ে গ্রিক শিবিরে সামরিক কৌশল শিখতে এসেছিলেন, যা তাঁর চরম দেশপ্রেমের প্রমাণ দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, চন্দ্রগুপ্ত একজন খাঁটি বীর ও দেশপ্রেমিক। তাঁর এই চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখেই দিগ্বিজয়ী সম্রাট সেকেন্দার মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিনা শাস্তিতে মুক্তি দিয়েছিলেন।
2. ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশে গ্রিক সম্রাট সেকেন্দারের চরিত্রের কোন্ কোন্ দিক প্রকাশ পেয়েছে, তা বিস্তারিত লেখো। (5)
উত্তর দেখো
ঐতিহাসিক নাট্যাংশ ‘চন্দ্রগুপ্ত’-এ গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার (আলেকজান্ডার) একজন দিগ্বিজয়ী বীর হলেও, তাঁর চরিত্রের অত্যন্ত মানবিক ও মহৎ দিকগুলি লেখক সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন:
- প্রকৃতিপ্রেমী ও সৌন্দর্যবোধ: ভারত আক্রমণ করতে এসে সেকেন্দার এ দেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে মুগ্ধ হয়েছেন। দিনের তীব্র সূর্য এবং রাতের স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নামাখা আকাশের অপূর্ব বর্ণনা তাঁর গভীর সৌন্দর্যবোধের পরিচয় দেয়।
- বীরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল: সেকেন্দার শুধু নিজের জয় নিয়ে অহংকার করেননি। ভারতীয় রাজা পুরু পরাজিত ও বন্দি হয়েও তাঁর কাছে যখন রাজার মতো সম্মান দাবি করেছিলেন, তখন সেকেন্দার ক্ষুব্ধ না হয়ে তাঁর বীরত্বকে সম্মান জানিয়েছিলেন।
- বিশাল মহানুভবতা ও ঔদার্য: গুপ্তচর সন্দেহে বন্দি চন্দ্রগুপ্তকে তিনি সহজেই মৃত্যুদণ্ড দিতে পারতেন। কিন্তু চন্দ্রগুপ্তের অসীম নির্ভীকতা, স্পষ্টবাদিতা এবং মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা দেখে তিনি মুগ্ধ হন। একজন খাঁটি বীর হিসেবে তিনি অপর একজন বীরের মর্যাদা রক্ষা করেন এবং চন্দ্রগুপ্তকে সসম্মানে মুক্তি দেন।
অতএব, সেকেন্দার কেবল একজন ক্ষমতাবান সম্রাটই ছিলেন না, তাঁর চরিত্রের বিশাল ঔদার্য ও মহানুভবতা তাঁকে একজন প্রকৃত মহামানবে পরিণত করেছে।
3. “সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!” – সেকেন্দারের চোখে এই দেশের যে বৈচিত্র্য ধরা পড়েছে, তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো। (5)
উত্তর দেখো
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশের শুরুতেই গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার তাঁর সেনাপতি সেলুকাসের কাছে ভারতবর্ষের অপরূপ প্রাকৃতিক ও চারিত্রিক বৈচিত্র্যের মুগ্ধ বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর চোখে ধরা পড়া বৈচিত্র্যগুলি হলো:
প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য: বিশ্বজয়ে বেরিয়ে সেকেন্দার এমন আশ্চর্য দেশ আর কোথাও দেখেননি। তিনি দেখেছেন, দিনের বেলায় এ দেশের আকাশে প্রচণ্ড সূর্য যেন আগুন ঢেলে নীল আকাশকে পুড়িয়ে দিয়ে যায়। আবার রাতেই সেই দৃশ্য সম্পূর্ণ বদলে যায়। শুভ্র চন্দ্রমা এসে যেন সেই দগ্ধ আকাশকে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নামাখা আলোয় স্নান করিয়ে শান্ত করে দেয়। প্রকৃতির এই অভাবনীয় রূপান্তর তাঁকে বিস্মিত করেছে।
মানুষের চারিত্রিক বৈচিত্র্য: কেবল প্রকৃতি নয়, এ দেশের মানুষের শৌর্যবীর্যও তাঁর কাছে সমান বিচিত্র মনে হয়েছে। তিনি দেখেছেন, ভারতীয় বীরেরা শুধু বাহুবলেই বলীয়ান নয়, তাঁদের অন্তরে রয়েছে প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ। রাজা পুরু গ্রিকদের কাছে পরাজিত ও বন্দি হয়েও মাথা নত করেননি, বরং সেকেন্দারের চোখে চোখ রেখে রাজার মতো সম্মান দাবি করেছিলেন। এ দেশের প্রকৃতি ও মানুষের এই অসীম বৈচিত্র্য এবং বীরত্ব দেখেই সেকেন্দার ভারতবর্ষকে ‘বিচিত্র’ বলে মন্তব্য করেছেন।
4. ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (5)
উত্তর দেখো
সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক, কারণ সার্থক নামকরণের মাধ্যমেই রচনার মূল সুর পাঠকের মনে অনুরণিত হয়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত আলোচ্য ঐতিহাসিক নাট্যাংশটির ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নামকরণ সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক হয়েছে।
নাট্যাংশের শুরুতে গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার এবং তাঁর সেনাপতি সেলুকাসের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের বর্ণনা এবং রাজা পুরুর বীরত্বের কথা উঠে এসেছে। কিন্তু নাটকের মূল মোড় ঘুরে যায় যখন গ্রিক সেনাপতি আন্তিগোনস মগধের তরুণ রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্তকে বন্দি করে সম্রাটের সামনে নিয়ে আসেন। চন্দ্রগুপ্তের নির্ভীক স্বীকারোক্তি, সেকেন্দারের চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট ভাষায় নিজের উদ্দেশ্য বর্ণনা এবং কাপুরুষোচিত আক্রমণের বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র প্রতিবাদ— এই সবকিছুই সমগ্র দৃশ্যটিকে এক অভাবনীয় উত্তেজনার শিখরে নিয়ে যায়।
সেকেন্দার একজন দিগ্বিজয়ী সম্রাট হলেও, নাট্যাংশের শেষে চন্দ্রগুপ্তের অসীম সাহসিকতা, তেজ এবং দেশপ্রেমের কাছে গ্রিক সম্রাটের অহংকার মাথা নত করেছে। সেকেন্দার মুগ্ধ হয়ে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছেন। সমগ্র নাট্যাংশে সেকেন্দারের উপস্থিতি বেশি থাকলেও, ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু এবং মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছেন ওই তরুণ যুবকই। তাই চরিত্রকেন্দ্রিক এই ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নামকরণটি আক্ষরিক অর্থেই যথাযথ ও সার্থক।
5. চন্দ্রগুপ্ত কীভাবে গ্রিক রণকৌশল শিখছিলেন এবং ধরা পড়ার পর কী ঘটেছিল তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো। (5)
উত্তর দেখো
রণকৌশল শেখার প্রেক্ষাপট: মগধের রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্তকে তাঁর সৎভাই নন্দরাজ অন্যায়ভাবে নির্বাসিত করেছিলেন। হৃত রাজ্য উদ্ধারের উদ্দেশ্যে চন্দ্রগুপ্ত গ্রিক শিবিরে প্রবেশ করেন। গ্রিক সেনাপতি সেলুকাস চন্দ্রগুপ্তের সামরিক প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিজের শিষ্যের মতো গ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত বন্ধুসুলভ আচরণের মাধ্যমে অস্ত্রপরীক্ষা ও উন্নত গ্রিক রণকৌশল শিক্ষা দিতে শুরু করেন।
ধরা পড়ার পরের ঘটনা: চন্দ্রগুপ্ত যখন মনোযোগ সহকারে গ্রিক বাহিনীর সামরিক কৌশল পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তখন আন্তিগোনস তাঁকে গুপ্তচর সন্দেহে বন্দি করে সেকেন্দারের সামনে নিয়ে আসেন। কিন্তু চন্দ্রগুপ্ত ভয় না পেয়ে সম্রাটকে স্পষ্ট জানান যে তিনি গুপ্তচর নন, বরং রণকৌশল শিখতে এসেছেন। চন্দ্রগুপ্ত এও বলেন যে সম্রাটের যেমন শিবিরে অধিকার আছে, চন্দ্রগুপ্তেরও ঠিক তেমনি অধিকার। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আন্তিগোনস চন্দ্রগুপ্তকে পিছন থেকে আক্রমণ করতে গেলে সেলুকাস নিজের তরবারি বের করে শিষ্যকে রক্ষা করেন। পরিশেষে, চন্দ্রগুপ্তের এই অসীম নির্ভীকতা ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে সেকেন্দার তাঁকে কোনো শাস্তি না দিয়েই সসম্মানে মুক্তি দেন।
6. “আমি গুপ্তচর নই।” – চন্দ্রগুপ্তের এই উক্তির পর গ্রিক শিবিরে যে অভাবনীয় নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা পাঠ্যাংশ অবলম্বনে লেখো। (5)
উত্তর দেখো
গ্রিক সেনাপতি আন্তিগোনস চন্দ্রগুপ্তকে গুপ্তচর সন্দেহে বন্দি করে সেকেন্দারের সামনে আনলে, চন্দ্রগুপ্ত নির্ভীকভাবে “আমি গুপ্তচর নই” বলে প্রতিবাদ করেন। এরপরই শিবিরে এক চরম নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সেকেন্দার তাঁকে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করলে চন্দ্রগুপ্ত জানান যে, তিনি মগধের নির্বাসিত রাজপুত্র এবং হৃত রাজ্য উদ্ধারের জন্যই গ্রিক সেনাপতি সেলুকাসের কাছে গ্রিক রণকৌশল শিখছিলেন। বিনা অনুমতিতে প্রবেশের অভিযোগ উঠলে চন্দ্রগুপ্ত স্পষ্ট জানান যে, সেকেন্দার যেমন তরবারির জোরে ভারতবর্ষে ঢুকেছেন, তিনিও তেমনি শিবিরে ঢুকেছেন। এই চরম স্পষ্ট কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে আন্তিগোনস পিছন থেকে নিরস্ত্র চন্দ্রগুপ্তকে আক্রমণ করতে উদ্যত হন।
ঠিক সেই মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে সেলুকাস নিজের তরবারি কোষমুক্ত করে তাঁর শিষ্য চন্দ্রগুপ্তকে রক্ষা করার জন্য রুখে দাঁড়ান। শিবিরে দুই গ্রিক সেনাপতির মধ্যে লড়াই বাঁধার উপক্রম হয়। তখন সম্রাট সেকেন্দার হস্তক্ষেপ করেন। তিনি চন্দ্রগুপ্তের এই অসীম বীরত্ব, মাতৃভূমির প্রতি টান এবং নির্ভীক প্রতিবাদ দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। একজন দিগ্বিজয়ী সম্রাট হয়েও তিনি এই তরুণ ভারতীয় যুবকের সাহসিকতার কাছে নতি স্বীকার করে তাঁকে সসম্মানে মুক্ত করে দেন।