অষ্টম শ্রেণি: বাংলা, অধ্যায় – 4 বনভোজনের ব্যাপার – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5
অধ্যায় 4: বনভোজনের ব্যাপার
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘বনভোজনের ব্যাপার’ গল্পে হাসির যে উপাদানগুলি ছড়িয়ে আছে, তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় রচিত ‘বনভোজনের ব্যাপার’ একটি আদ্যোপান্ত হাস্যরসাত্মক গল্প। গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লেখক চূড়ান্ত মজাদার পরিস্থিতির মাধ্যমে হাসির ফোয়ারা ছুটিয়েছেন।
- খাদ্যতালিকা বা মেনু বিভ্রাট: রাজকীয় পোলাও, মাংস এবং রুই মাছের কালিয়া দিয়ে বনভোজনের কল্পনা শুরু হলেও, পকেটে টান পড়ায় শেষপর্যন্ত তা খিচুড়ি আর আলুভাজায় নেমে আসে, যা গল্পের শুরুতে হাসির উদ্রেক করে।
- প্যালার দুর্দশা ও হাবুলের বোকামি: চাল ধুতে গিয়ে পুকুরের কাদায় পড়ে গিয়ে প্যালার ভূত হয়ে যাওয়া এবং হাবুল সেনের বোকামিতে প্রায় হয়ে আসা খিচুড়ির হাঁড়িতে এক হাঁড়ি কাঁচা জল ঢেলে দিয়ে তাকে পাতলা কাদায় পরিণত করার দৃশ্যটি চূড়ান্ত হাস্যকর।
- বাঁদরের উৎপাত: বন্ধুরা যখন নিজেদের মধ্যে দোষারোপ করে তুমুল ঝগড়া করছে, তখন একদল বাঁদর এসে বাগানের সমস্ত খাবার তছনছ করে দেয় এবং একটি ধেড়ে বাঁদর রসগোল্লার হাঁড়ি নিয়ে গাছে উঠে যায়। শেষে খিদের জ্বালায় চার বন্ধুর টক জলপাই আর নুন খেয়ে পেট ভরানোর করুণ অথচ মজাদার পরিণতিই এই গল্পের সেরা হাসির উপাদান।
2. ‘বনভোজনের ব্যাপার’ গল্প অবলম্বনে টেনিদার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের এক অমর এবং মজাদার চরিত্র হলো টেনিদা। ‘বনভোজনের ব্যাপার’ গল্পে টেনিদার চরিত্রের যে বৈশিষ্ট্যগুলি ফুটে উঠেছে তা হলো:
- নেতৃত্ব দেওয়ার প্রবণতা ও ফাঁকিবাজি: টেনিদা চার বন্ধুর দলের অবিসংবাদিত নেতা। কিন্তু সে অত্যন্ত ফাঁকিবাজ। বনভোজনের সময় সে নিজে কোনো কাজ না করে শুধু দলপতির মতো সবার উপর হুকুম চালায় এবং অন্যদের কাজের সমালোচনা করে।
- ভোজনরসিক ও চালাক: টেনিদা চরম ভোজনরসিক। বনভোজনের রাজকীয় খাবারের তালিকা শুনে তার জিভে জল আসে। কিন্তু সে এতটাই চালাক যে, দলের ‘লিডার’ হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে নিজে এক পয়সাও চাঁদা দেয়নি। উলটে বিনা পরিশ্রমে এবং বিনা পয়সায় ভালো খাবার খাওয়ার আশায় সে রান্নার তদারকি করার ভার নিজের কাঁধে তুলে নেয়।
- উপস্থিত বুদ্ধি ও রসবোধ: কাদামাখা প্যালাকে দেখে ‘পাঁক-ভূত’ বলা বা রান্নার সময় নানা মজাদার মন্তব্যের মধ্য দিয়ে টেনিদার তীক্ষ্ণ রসবোধ এবং উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়।
সার্বিকভাবে, টেনিদা একজন আড্ডাবাজ, ফাঁকিবাজ অথচ অত্যন্ত মজাদার ও প্রাণবন্ত কিশোর চরিত্র।
3. বনভোজনের রান্নার সময় যে চরম বিশৃঙ্খলা ও মজার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো। (5)
উত্তর দেখো
‘বনভোজনের ব্যাপার’ গল্পে বাগুইআটির বাগানে রান্নার সময় এক চরম বিশৃঙ্খলা ও হাসির দৃশ্যের অবতারণা হয়।
রান্না শুরু হতেই প্রথম বিপত্তি ঘটায় প্যালা। চাল ধুতে গিয়ে সে পুকুরের কাদায় পড়ে এক্কেবারে ভূত হয়ে ফিরে আসে। সেই কাদা ও কাঁকর মেশানো চাল দিয়েই খিচুড়ি বসানো হয়। ক্যাবলা অত্যন্ত মন দিয়ে ডিমের ডালনা রান্না করলেও খিচুড়ির ক্ষেত্রে ঘটে আসল বিপর্যয়। খিচুড়ি যখন প্রায় হয়ে এসেছে, তখন হাবুল সেন চরম বোকামি করে তাতে এক হাঁড়ি কাঁচা জল ঢেলে দেয়। ফলে খিচুড়ি একেবারে পাতলা কাদা বা স্যুপের মতো হয়ে যায়।
রান্নার এই বারোটা বাজার পর চার বন্ধু নিজেদের মধ্যে দোষারোপ শুরু করে। টেনিদা হাবুলকে বকাবকি করে, ক্যাবলা প্যালার কাঁকর মেশানো চালকে দোষ দেয়। এই তুমুল ঝগড়া ও চেঁচামেচির সুযোগে বাগানের গাছ থেকে একদল বাঁদর নেমে এসে রান্নার জায়গায় চরম উৎপাত শুরু করে। তারা চাল-ডাল মাটিতে ছড়িয়ে দেয় এবং বহু কষ্টে আনা রসগোল্লার হাঁড়িটি নিয়ে সোজা গাছের মগডালে উঠে যায়। এভাবেই পুরো রান্নার পর্বটি এক চরম বিশৃঙ্খল ও হাস্যকর পরিস্থিতিতে পরিণত হয়।
4. ‘বনভোজনের ব্যাপার’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (5)
উত্তর দেখো
সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক, কারণ সার্থক নামকরণের মাধ্যমেই রচনার মূল বিষয়বস্তু পাঠকের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের আলোচ্য গল্পটির ‘বনভোজনের ব্যাপার’ নামকরণটি বিষয়বস্তুর দিক থেকে সম্পূর্ণ সার্থক।
গল্পের শুরু থেকেই টেনিদা, হাবুল, ক্যাবলা এবং প্যালাকে নিয়ে একটি বনভোজনের পরিকল্পনা চলতে থাকে। কী খাবার হবে, কোথায় যাওয়া হবে, কে চাঁদা দেবে— এই সমস্ত আয়োজন নিয়েই গল্পের প্রথম অংশ আবর্তিত হয়েছে। গল্পের দ্বিতীয় অংশে বাগুইআটির বাগানে গিয়ে রান্না শুরু করা, চাল ধুতে গিয়ে প্যালার কাদায় পড়া, হাবুল সেনের খিচুড়িতে জল ঢালা এবং শেষে নিজেদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া— এই সমস্ত মজাদার ঘটনাগুলি বনভোজনকে কেন্দ্র করেই ঘটেছে।
সবশেষে, বাঁদরের উৎপাতে সমস্ত খাবার নষ্ট হওয়া এবং খিদের জ্বালায় বাধ্য হয়ে টক জলপাই খাওয়ার মধ্য দিয়ে বনভোজন যে করুণ কিন্তু হাস্যকর পরিণতি লাভ করে, তা গল্পের মূল আকর্ষণ। যেহেতু সমগ্র গল্পটি বনভোজনের আয়োজন, তার বিশৃঙ্খলা এবং তার মজাদার পরিণতিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে, তাই ‘বনভোজনের ব্যাপার’ নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও অত্যন্ত মানানসই হয়েছে।
5. বনভোজনের খাদ্যতালিকা (মেনু) প্রথমে কী ঠিক হয়েছিল এবং পরে কী কারণে তা বদলে যায়? মেনু বদলের পর রান্নার দায়িত্ব কে কীভাবে পালন করেছিল? (2+3=5)
উত্তর দেখো
প্রাথমিক মেনু ও বদলের কারণ: শুরুতে বনভোজনের জন্য অত্যন্ত রাজকীয় খাবারের কথা ভাবা হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল পোলাও, রুই মাছের কালিয়া এবং মুরগির মাংস রান্না হবে। কিন্তু চার বন্ধুর পকেটে চাঁদার টাকা খুব কম ওঠায় সেই বিশাল খরচের বাজেটে কুলিয়ে ওঠা সম্ভব ছিল না। তাই টাকার অভাবে বাধ্য হয়েই মেনু বদলে খিচুড়ি, আলুভাজা, ডিমের ডালনা এবং রসগোল্লা করা হয়।
রান্নার দায়িত্ব পালন: মেনু ঠিক হওয়ার পর কাজের ভার ভাগ করে নেওয়া হয়। প্যালার পিলের ব্যামো থাকায় তাকে কেবল চাল ধোয়ার সহজ কাজ দেওয়া হয়। হাবুল সেন বাজার থেকে রসগোল্লা কিনে আনে এবং রান্নার জোগাড়ে সাহায্য করে। ক্যাবলার রান্নার হাত ভালো হওয়ায় সে ডিমের ডালনা তৈরির দায়িত্ব নেয় এবং অত্যন্ত যত্নের সাথে তা রান্না করে। অন্যদিকে, দলের নেতা টেনিদা ফাঁকিবাজি করে কোনো কাজ না নিয়ে শুধুমাত্র সমস্ত রান্নার তদারকি করা বা হুকুম চালানোর ভার নিজের হাতে তুলে নেয়।
6. শেষ পর্যন্ত চার বন্ধুর বনভোজন কীভাবে ‘ফলভোজনে’ পরিণত হলো, তা গল্প অবলম্বনে বুঝিয়ে দাও। (5)
উত্তর দেখো
টেনিদা, হাবুল, ক্যাবলা এবং প্যালার বহু প্রতীক্ষিত বনভোজন তাদের নিজেদের বোকামি ও পরিস্থিতির শিকার হয়ে এক করুণ অথচ হাস্যকর পরিণতি লাভ করে।
রান্নার সময় হাবুল সেনের বোকামিতে খিচুড়ি পাতলা কাদায় পরিণত হলে চার বন্ধুর মধ্যে কে দায়ী তা নিয়ে তুমুল ঝগড়া ও চেঁচামেচি শুরু হয়। নিজেদের মধ্যে এই মারামারির সময় তারা রান্নার জিনিসপত্রের দিক থেকে মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। এই সুবর্ণ সুযোগে বাগানের গাছ থেকে একদল বাঁদর নিচে নেমে এসে রান্নার জায়গায় চরম উৎপাত শুরু করে। বাঁদরেরা বনভোজনের জন্য আনা চাল, ডাল, আলু সবকিছু মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নষ্ট করে দেয়। একটি বড়ো বাঁদর তো বহু কষ্টে কেনা রসগোল্লার হাঁড়িটি নিয়েই গাছের মগডালে উঠে যায়। এমনকি ক্যাবলার যত্নে রাঁধা ডিমের ডালনাও তারা নষ্ট করে ফেলে।
বাঁদরের ভয়ে চার বন্ধু বাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে নিজেদের খাবার নষ্ট হতে দেখে। সারাদিনের পরিশ্রমের পর খাবার হারিয়ে তাদের পেটে তখন প্রবল খিদে। শেষে আর কোনো উপায় না পেয়ে, চরম খিদের জ্বালা মেটাতে তারা বাগানের টক জলপাই পেড়ে নুন মাখিয়ে খায়। এভাবেই রান্না করা ভালোমন্দ খাবারের বদলে কাঁচা ফল খেয়ে পেট ভরাতে হওয়ায় তাদের সাধের বনভোজন শেষমেশ ‘ফলভোজনে’ পরিণত হয়।