অষ্টম শ্রেণি: বাংলা, অধ্যায় – 5: সবুজ জামা – বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3
অধ্যায় 5: সবুজ জামা
(ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 3)
নিচের উক্তিগুলির উৎস, প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো:
1. “গাছেরা কেমন সবুজ জামা পরে থাকে” – উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য পঙ্ক্তিটি কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘সবুজ জামা’ কবিতা থেকে গৃহীত হয়েছে।
প্রসঙ্গ: ছোট্ট তোতাইবাবুর প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতার কথা বোঝাতে গিয়ে কবি এই উক্তিটি করেছেন।
তাৎপর্য: গাছেদের সারা শরীর সুন্দর সবুজ পাতায় ঢাকা থাকে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন গাছেরা সবুজ রঙের একটি সুন্দর জামা পরে আছে। প্রকৃতির এই সজীবতা ও শ্যামল রূপ ছোট্ট তোতাইবাবুর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। গাছের এই সবুজ পাতার আচ্ছাদনকেই কবিতায় ‘সবুজ জামা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রাণশক্তির প্রতীক।
2. “আমাদের তোতাইবাবুরও একটি সবুজ জামা চাই” – তোতাইবাবুর সবুজ জামা চাই কেন?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘সবুজ জামা’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: তোতাইবাবুর প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করতে গিয়ে কবি এ কথা বলেছেন।
তাৎপর্য: তোতাইবাবু লক্ষ্য করেছে যে, গাছের সবুজ পাতায় ঘেরা ডালে রঙিন প্রজাপতি এসে বসে। তোতাইবাবু প্রজাপতি ভালোবাসে এবং তাদের সঙ্গ পেতে চায়। তার শিশুসুলভ বিশ্বাস হলো, সে যদি গাছের মতো সবুজ জামা পরে, তবে রঙিন প্রজাপতিরা তাকে গাছ ভেবে ভুল করবে এবং নিশ্চিন্তে তার গায়ে এসে বসবে। এই আনন্দ পাওয়ার জন্যই তার সবুজ জামা চাই।
3. “দাদু যেন কেমন!” – তোতাইবাবুর কেন দাদুকে ‘কেমন’ বা অদ্ভুত মনে হয়েছে?
উত্তর দেখো
উৎস: উক্তিটি কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘সবুজ জামা’ কবিতা থেকে সংকলিত।
প্রসঙ্গ: দাদুর আচরণ তোতাইবাবুর কাছে কৃত্রিম ও নিরানন্দ মনে হওয়ায় সে এই মন্তব্য করেছে।
তাৎপর্য: তোতাইবাবু প্রকৃতির খোলা পরিবেশে থাকতে এবং প্রজাপতির সঙ্গ পেতে ভালোবাসে। অন্যদিকে তার দাদু চোখে চশমা দিয়ে সারাদিন বইয়ের পাতার নীরস অক্ষরগুলি নিয়ে পড়ে থাকেন। দাদু তোতাইবাবুকেও সেই নীরস অক্ষর পড়তে বলেন। প্রকৃতির সজীব সৌন্দর্য উপভোগ না করে সারাদিন বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকা দাদুর এই যান্ত্রিক আচরণ তোতাইবাবুর কাছে অত্যন্ত অদ্ভুত বা ‘কেমন’ মনে হয়েছে।
4. “দাদুর চশমায় তো আর প্রজাপতি বসে না!” – দাদুর চশমায় প্রজাপতি না বসার কারণ কী?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য পঙ্ক্তিটি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘সবুজ জামা’ কবিতা থেকে গৃহীত।
প্রসঙ্গ: কৃত্রিমতার সাথে প্রকৃতির দূরত্বের বিষয়টি বোঝাতে কবি এখানে দাদুর চশমার রূপক ব্যবহার করেছেন।
তাৎপর্য: প্রজাপতি হলো প্রাণবন্ত প্রকৃতির এক অপূর্ব সুন্দর অঙ্গ। তারা সজীব, সুগন্ধি এবং সতেজ পাতা বা ফুলের ওপরেই বসতে ভালোবাসে। দাদুর চশমা হলো আধুনিক যান্ত্রিকতা এবং কৃত্রিমতার প্রতীক, যা সম্পূর্ণ প্রাণহীন ও নীরস। যেহেতু চশমার মধ্যে প্রাণের কোনো স্পন্দন নেই, তাই প্রকৃতির স্বাধীন প্রজাপতিরা কখনো কৃত্রিম চশমায় এসে বসে না।
5. “ওরে, অ আ ক খ পড়” – কে, কাকে এ কথা বলেছেন? এর উত্তরে সে কী করে?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘সবুজ জামা’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: দাদু যখন তোতাইবাবুকে পুঁথিগত শিক্ষা দিতে চান, তখনকার বর্ণনা এটি।
তাৎপর্য: তোতাইবাবুর বয়স্ক দাদু ছোট্ট তোতাইবাবুকে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলেছেন। দাদু চান তোতাইবাবু পড়াশোনা শিখুক। কিন্তু তোতাইবাবুর বইয়ের পাতার নীরস বর্ণমালার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তাই দাদুর এই কথার উত্তরে সে বইয়ের পাতা না পড়ে, তার বদলে গাছের মতো এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার ভান করে, যাতে সে প্রকৃতির আরও কাছাকাছি যেতে পারে।
6. “কিন্তু তোতাইবাবু বইয়ের পাতা পড়ে না” – সে বইয়ের পাতা পড়তে চায় না কেন?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য পঙ্ক্তিটি কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘সবুজ জামা’ কবিতা থেকে চয়ন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গ: পুঁথিগত শিক্ষার প্রতি তোতাইবাবুর অনীহা বা অনাগ্রহের কথা এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
তাৎপর্য: ছোট্ট তোতাইবাবু বইয়ের পাতায় ছাপা কালো অক্ষরগুলিকে নিষ্প্রাণ এবং নীরস বলে মনে করে। সে চার দেওয়ালের মাঝে আটকে থাকতে রাজি নয়। তার কাছে প্রকৃত আনন্দের জায়গা হলো খোলা আকাশ, সবুজ গাছপালা এবং রঙিন প্রজাপতি। যান্ত্রিক ও পুঁথিগত শিক্ষার চেয়ে সে প্রকৃতির পাঠশালা বেশি ভালোবাসে বলেই বইয়ের পাতা পড়তে চায় না।
7. “সে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকে।” – একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকার তাৎপর্য কী?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘সবুজ জামা’ কবিতা থেকে সংগৃহীত।
প্রসঙ্গ: তোতাইবাবুর গাছের সাথে একাত্ম হওয়ার তীব্র বাসনার কথা বোঝাতে কবি এই উক্তিটি করেছেন।
তাৎপর্য: গাছ যেমন তার একটি মাত্র কাণ্ডের ওপর বা এক পায়ে ভর দিয়ে মাটির বুকে শান্ত ও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, ছোট্ট তোতাইবাবুও ঠিক সেভাবেই এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এর মাধ্যমে সে নিজেকে একটি গাছের মতো কল্পনা করে। এই আচরণের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির সাথে এক হয়ে যাওয়ার জন্য তোতাইবাবুর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শিশুসুলভ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।
8. “সবুজ জামা পরলে তবেই তো তার ডালে এসে বসবে” – কার ডালে, কারা এসে বসবে?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘সবুজ জামা’ কবিতা থেকে গৃহীত।
প্রসঙ্গ: তোতাইবাবুর সবুজ জামা পরার পেছনের মূল কারণটিকে কবি এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
তাৎপর্য: এখানে তোতাইবাবুর হাতের ডাল বা শরীরের কথা বলা হয়েছে, যেখানে সুন্দর লাল নীল প্রজাপতিরা এসে বসবে। তোতাইবাবু মনে করে, গাছের সবুজ পাতাগুলি হলো তাদের সবুজ জামা, আর সেই সবুজ দেখেই প্রজাপতিরা ছুটে আসে। তাই সে নিজেও একটি সবুজ জামা পরতে চায়, যাতে প্রজাপতিরা তাকে গাছ ভেবে তার হাত নামক ডালে এসে বসে।
9. “ডালে এসে বসবে লাল নীল প্রজাপতি” – কবিতায় প্রজাপতি কীসের প্রতীক?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘সবুজ জামা’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: তোতাইবাবুর প্রজাপতির প্রতি গভীর আকর্ষণের কথা বোঝাতে কবি এই পঙ্ক্তিটির অবতারণা করেছেন।
তাৎপর্য: কবিতায় প্রজাপতি হলো প্রকৃতির সজীবতা, সৌন্দর্য, বর্ণময়তা এবং পরম স্বাধীনতার এক অপূর্ব প্রতীক। তোতাইবাবুর কাছে বইয়ের কালো অক্ষরগুলি হলো নীরস ও আনন্দহীন, কিন্তু রঙিন প্রজাপতি হলো মুক্তির আনন্দ। প্রজাপতির সঙ্গ পাওয়ার অর্থ হলো, চার দেওয়ালের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে প্রাণবন্ত প্রকৃতির কোলে নিজেকে সঁপে দেওয়া।
10. তোতাইবাবু কেন ইস্কুলে যেতে চায় না, তা কবিতা অবলম্বনে বুঝিয়ে দাও।
উত্তর দেখো
উৎস: বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘সবুজ জামা’ কবিতার মূল ভাব অবলম্বন করে এর উত্তর দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: প্রথাগত শিক্ষার প্রতি তোতাইবাবুর প্রবল অনীহা প্রকাশের কারণ বর্ণনা করা হয়েছে।
তাৎপর্য: তোতাইবাবু একজন প্রকৃতিপ্রেমী এবং স্বাধীনতাপ্রিয় শিশু। তার কাছে স্কুলের চার দেওয়াল হলো একটি খাঁচা বা বন্দিশালা। সেখানে জোর করে বর্ণমালা মুখস্থ করানো হয়, যা তার কাছে অত্যন্ত একঘেয়ে এবং নিরানন্দ। সে চায় প্রকৃতির বিশাল ও উন্মুক্ত পাঠশালায় গাছের মতো বেড়ে উঠতে। এই স্বাধীনতার অভাবেই সে ইস্কুলে যেতে চায় না।
11. দাদু এবং তোতাইবাবুর ভাবনার বৈপরীত্য কীভাবে কবিতায় ফুটে উঠেছে?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য বিষয়টি কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘সবুজ জামা’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: দুটি ভিন্ন প্রজন্মের চিন্তা-চেতনার পার্থক্যের দিকটি তুলে ধরতে গিয়ে এই বৈপরীত্য দেখানো হয়েছে।
তাৎপর্য: দাদু হলেন আধুনিক যান্ত্রিকতা এবং পুঁথিগত শিক্ষার প্রতীক। তিনি চশমা ছাড়া জগৎ দেখতে পান না এবং চার দেওয়ালের মাঝে বই পড়াটাকেই সব মনে করেন। অন্যদিকে তোতাইবাবু হলো সজীবতা ও স্বাধীনতার প্রতীক। সে কৃত্রিম চশমা বা বইয়ের বদলে প্রকৃতির খোলা হাওয়া, গাছ এবং প্রজাপতিকে ভালোবাসে। এভাবেই যান্ত্রিকতার সাথে প্রকৃতির বৈপরীত্য কবিতায় ফুটে উঠেছে।
12. ‘সবুজ জামা’ বলতে কবি প্রকৃতপক্ষে কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য বিষয়টি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘সবুজ জামা’ কবিতার মূল ভাব থেকে সংগৃহীত।
প্রসঙ্গ: কবিতার নামকরণের গভীরে লুকিয়ে থাকা অন্তর্নিহিত রূপক অর্থটি এখানে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তাৎপর্য: বাহ্যিক অর্থে ‘সবুজ জামা’ বলতে গাছের পাতাকে বোঝানো হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি একটি রূপক। কবি ‘সবুজ জামা’ বলতে নিজেকে প্রকৃতির সজীবতা, নির্মলতা এবং সতেজতার আবরণে ঢেকে রাখাকে বুঝিয়েছেন। আধুনিক কংক্রিটের সভ্যতায় মানুষ যখন গাছ কেটে ফেলছে, তখন এই ‘সবুজ জামা’ পরার আকাঙ্ক্ষা আসলে পরিবেশ বাঁচানোর এবং মনকে সবুজে ভরিয়ে তোলার এক গভীর আবেদন।