অষ্টম শ্রেণি: বাংলা, দ্বিতীয় পাঠ: চিঠি – মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3
অধ্যায় 6: চিঠি
(ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 3)
নিচের উক্তিগুলির উৎস, প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো:
1. “জাহাজটি খুব চমৎকার, আর আমরা খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছি…” – বক্তা কে? জাহাজটির নাম কী ছিল?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা প্রথম চিঠি থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: বন্ধু গৌরদাস বসাককে নিজের বিলেত যাত্রার বিবরণ দেওয়ার সময় মধুসূদন এ কথা লিখেছেন।
তাৎপর্য: বক্তা হলেন স্বয়ং কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি আইন বা ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে বিলেত যাচ্ছিলেন। যে জাহাজটিতে করে তিনি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছিলেন, সেই জাহাজটির নাম ছিল ‘সীলোন’ (Ceylon)। এই জাহাজের চমৎকার পরিবেশ এবং দ্রুতগতিতে গন্তব্যে পৌঁছানোর আনন্দই এই উক্তির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
2. “আমি আশা করছি যে, আমি স্বদেশে ফিরে অত্যন্ত সম্মানজনক জীবন যাপন করতে পারব।” – বক্তার এমন আশার কারণ কী?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি মধুসূদন দত্তের লেখা ‘চিঠি’ গদ্যাংশের প্রথম চিঠি থেকে সংকলিত।
প্রসঙ্গ: বিলেতে যাওয়ার উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা বন্ধু গৌরদাসকে জানানোর সময় কবি এই মন্তব্য করেছেন।
তাৎপর্য: মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করলেও শুধুমাত্র সাহিত্যচর্চা করে তাঁর সংসার ও অভাব মিটছিল না। তাই প্রচুর অর্থ উপার্জন এবং সমাজে নিজের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় তিনি ইংল্যান্ডে গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ব্যারিস্টার হতে পারলে দেশে ফিরে তিনি প্রচুর অর্থের মালিক হবেন এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ জীবন কাটাবেন, এটাই ছিল তাঁর আশা।
3. “আমি যে কী ভয়ংকর বিপদে পড়েছিলাম…” – বক্তা কে? তিনি কী বিপদে পড়েছিলেন?
উত্তর দেখো
উৎস: উক্তিটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা দ্বিতীয় চিঠি থেকে গৃহীত, যা তিনি বিদ্যাসাগরকে লিখেছিলেন।
প্রসঙ্গ: ফ্রান্সে থাকাকালীন নিজের চরম দুর্দশার কথা বিদ্যাসাগর মহাশয়কে জানানোর সময় কবি এ কথা বলেছেন।
তাৎপর্য: বক্তা হলেন কবি মধুসূদন দত্ত। তিনি যখন সপরিবারে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে বসবাস করছিলেন, তখন দেশ থেকে তাঁর টাকা আসা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, দেশের সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলস্বরূপ, বিদেশে চরম অর্থকষ্টে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অনাহারে মৃত্যুর মুখে এসে দাঁড়ানোটাই ছিল তাঁর জীবনের ভয়ংকর বিপদ।
4. “আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল এই যে…” – জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুলটি কী ছিল?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি মধুসূদনের লেখা পাঠ্য ‘চিঠি’ গদ্যাংশ থেকে চয়ন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গ: নিজের বর্তমান অর্থকষ্টের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আক্ষেপের সুরে কবি এই মন্তব্য করেছেন।
তাৎপর্য: মধুসূদনের মতে, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল হলো বিদেশে আসার আগে দেশে তাঁর সমস্ত সম্পত্তির বা বিষয়-আশয়ের ভার অযোগ্য এবং প্রতারক লোকদের হাতে দিয়ে আসা। তাঁর অবর্তমানে সেই লোকগুলি বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং সম্পত্তির টাকা আত্মসাৎ করে ফ্রান্সে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেয়, যার জেরে কবিকে বিদেশে চরম দুর্গতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
5. “ফরাসি সরকারের কারাগারই হতো আমার বাসস্থান…” – কেন তাঁর বাসস্থান কারাগার হতে পারত?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে লেখা মধুসূদন দত্তের দ্বিতীয় চিঠি থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: বিদ্যাসাগরের পাঠানো টাকা না পেলে তাঁর কী করুণ পরিণতি হতো, তা বোঝাতেই এই উক্তি।
তাৎপর্য: ফ্রান্সে থাকার সময় মধুসূদন যখন চরম অর্থাভাবে পড়েন, তখন তাঁর কাছে বাড়িভাড়া বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার টাকা ছিল না। ভিনদেশে পাওনাদারদের টাকা মেটাতে না পারলে আইন অনুযায়ী ফরাসি সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে বন্দি করত। এই নিশ্চিত কারাবাসের হাত থেকে বিদ্যাসাগর মহাশয়ই টাকা পাঠিয়ে তাঁকে রক্ষা করেছিলেন।
6. “আপনি ব্যতীত আর কেউই আমাকে এই নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারত না।” – কাকে, কেন এ কথা বলা হয়েছে?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা ‘চিঠি’ প্রবন্ধ থেকে গৃহীত।
প্রসঙ্গ: চরম বিপদের দিনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাহায্য পেয়ে কবি গভীর কৃতজ্ঞতায় এই কথা বলেছেন।
তাৎপর্য: এখানে ‘আপনি’ বলতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বোঝানো হয়েছে। বিদেশে চরম অর্থাভাবে যখন মধুসূদনের মৃত্যু বা কারাবাস নিশ্চিত, তখন পরিচিত কেউই তাঁকে সাহায্য করেনি। একমাত্র বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজের চেষ্টায় ধার করে টাকা জোগাড় করে ফ্রান্সে পাঠিয়েছিলেন। তাই মধুসূদন মনে করেছেন, বিদ্যাসাগরের মতো দয়ালু মানুষ ছাড়া তাঁকে ওই বিপদ থেকে বাঁচানোর ক্ষমতা আর কারও ছিল না।
7. “এই পৃথিবীতে যা-কিছু আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি…” – বক্তা কীসের কথা বলেছেন?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি বিদ্যাসাগরকে লেখা মধুসূদনের চিঠি থেকে সংগৃহীত।
প্রসঙ্গ: বিদ্যাসাগরের পাঠানো টাকার কারণে স্ত্রী-সন্তানদের রক্ষা পাওয়ার আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে কবি এ কথা বলেছেন।
তাৎপর্য: এখানে কবি মধুসূদন দত্ত তাঁর স্ত্রী এবং সন্তানদের কথা বলেছেন। তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ একজন মানুষ ছিলেন। বিদ্যাসাগরের সাহায্য না পেলে বিদেশে অনাহারে তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের নিশ্চিত মৃত্যু হতো। পরিবারকে চরম ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরে একজন দায়িত্বশীল স্বামী ও পিতা হিসেবে তাঁর গভীর স্বস্তির অনুভূতি এই উক্তিতে ফুটে উঠেছে।
8. “তারা আজ আপনারই দেওয়া উপহার।” – ‘তারা’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে? কেন তাদের ‘উপহার’ বলা হয়েছে?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি মধুসূদন দত্তের লেখা ‘চিঠি’ গদ্যাংশ থেকে গৃহীত।
প্রসঙ্গ: বিদ্যাসাগরের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে গিয়ে কবি এই মন্তব্য করেছেন।
তাৎপর্য: ‘তারা’ বলতে এখানে মধুসূদনের স্ত্রী এবং সন্তানদের বোঝানো হয়েছে। ফ্রান্সে নিদারুণ অর্থকষ্টের কারণে মধুসূদনের পরিবার যখন অনাহারে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েছিল, তখন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পাঠানো টাকাই তাদের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। যেহেতু বিদ্যাসাগরের দয়াতেই তাঁর পরিবার নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে, তাই কবি গভীর শ্রদ্ধায় তাদের বিদ্যাসাগরের দেওয়া ‘উপহার’ বলে মনে করেছেন।
9. “আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন।” – কে, কাকে বাঁচিয়েছেন এবং কীভাবে?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি বিদ্যাসাগরকে লেখা মধুসূদনের চিঠি থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: বিপদের দিনে অকৃত্রিম সাহায্য পেয়ে বিদ্যাসাগরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে কবি এ কথা বলেছেন।
তাৎপর্য: এখানে দয়ার সাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে চরম বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। ফ্রান্সে প্রতারিত হয়ে মধুসূদন যখন চরম দারিদ্র্যের কারণে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে অনাহার এবং কারাবাসের মুখে, তখন বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজের চেষ্টায় ধার করে ফ্রান্সে প্রচুর টাকা পাঠান এবং কবিকে ওই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন।
10. “দয়াময় ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন” – বক্তা কেন এই প্রার্থনা করেছেন?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য পঙ্ক্তিটি মধুসূদন দত্তের লেখা ‘চিঠি’ প্রবন্ধের একেবারে শেষ অংশ থেকে চয়ন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গ: বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিঃস্বার্থ উপকারের প্রতিদান হিসেবে তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করে কবি এই প্রার্থনা করেছেন।
তাৎপর্য: বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজের কষ্ট ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ধার করে টাকা জোগাড় করে মধুসূদনকে ফ্রান্সে পাঠিয়ে তাঁর পুরো পরিবারকে অনাহার ও ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। এই অপরিসীম দয়া ও পরোপকারের ঋণ কোনোদিন শোধ করা সম্ভব নয়। তাই কৃতজ্ঞতায় অবনত হয়ে কবি কায়মনোবাক্যে ঈশ্বরের কাছে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মঙ্গল কামনা করেছেন।
11. মধুসূদনের চিঠি দুটিকে কেন ঐতিহাসিক দলিল বলা হয়?
উত্তর দেখো
উৎস: মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা পাঠ্য ‘চিঠি’ রচনার মূল ভাব থেকে এর উত্তর দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: বাংলা সাহিত্যে এই চিঠি দুটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আলোচনা করতে গিয়ে এ কথা বলা হয়।
তাৎপর্য: এই চিঠি দুটি নিছক কোনো ব্যক্তিগত বার্তা নয়, এটি বাংলা সাহিত্যের যুগান্তকারী স্রষ্টা মধুসূদন দত্ত এবং নবজাগরণের পথিকৃৎ বিদ্যাসাগরের মধ্যকার সম্পর্কের এক জীবন্ত প্রমাণ। এতে তৎকালীন যুগের সামাজিক প্রেক্ষাপট, মধুসূদনের বিলেত যাওয়ার উচ্চাশা এবং বিদেশে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের চরম উত্থান-পতনের বাস্তব চিত্র ধরা পড়েছে, যা ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল।
12. প্রথম চিঠিতে মধুসূদনের মনের কোন্ ভাব প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য বিষয়টি মধুসূদন দত্তের লেখা প্রথম চিঠি থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: বন্ধু গৌরদাস বসাককে লেখা চিঠিতে কবির মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণের কথা বলা হয়েছে।
তাৎপর্য: প্রথম চিঠিতে মধুসূদনের মনে প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা, উত্তেজনা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের এক সোনালি স্বপ্ন প্রকাশ পেয়েছে। তিনি সাহিত্যিক খ্যাতির পাশাপাশি সমাজে প্রতিষ্ঠা ও অর্থের জন্য ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেত যাচ্ছিলেন। সমুদ্রযাত্রার রোমাঞ্চ এবং ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরে প্রচুর অর্থ ও সম্মান লাভ করার প্রবল আত্মবিশ্বাস এই চিঠিতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।