অষ্টম শ্রেণি – বাংলা, তৃতীয় পাঠ, অধ্যায় -7, পরবাসী – বিষ্ণু দে, রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর মান 5

অধ্যায় 7: পরবাসী
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. ‘পরবাসী’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ সার্থক নামকরণের মাধ্যমেই রচনার মূল বিষয়বস্তু পাঠকের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কবি বিষ্ণু দে রচিত আলোচ্য কবিতাটির ‘পরবাসী’ নামকরণটি বিষয়বস্তু ও অন্তর্নিহিত ভাবসত্যের দিক থেকে সম্পূর্ণ সার্থক।

‘পরবাসী’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো ভিনদেশি বা যার নিজের কোনো নির্দিষ্ট বাসভূমি নেই। কবিতার প্রথম অংশে কবি বাংলার এক অপরূপ বন্য প্রকৃতির বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু দ্বিতীয় অংশে গিয়ে দেখা যায়, আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার আগ্রাসনে সেই জঙ্গল আজ সাফ হয়ে গেছে। নদী, পাহাড় এবং গাছপালা মানুষের কাছে তুচ্ছ হয়ে পড়েছে। মানুষ নিজের লোভের কারণে প্রকৃতির এই শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ ধ্বংস করে তাকে কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত করেছে।

প্রকৃতির এই ধ্বংসের কারণে মানুষ আজ নিজের বাসভূমিতেই আশ্রয়হীন ও শেকড়বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শান্ত ও সজীব আশ্রয়ের খোঁজে মানুষকে আজ যাযাবরের মতো তাঁবু বয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। নিজের জন্মভূমিতে আধুনিক মানুষের এই আশ্রয়হীনতা, একাকীত্ব এবং ভিনদেশি হয়ে যাওয়ার করুণ রূপটিই কবিতায় প্রধান হয়ে উঠেছে বলে ‘পরবাসী’ নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও শিল্পোত্তীর্ণ হয়েছে।

2. ‘পরবাসী’ কবিতায় প্রকৃতির যে অপরূপ ও আদিম সৌন্দর্যের চিত্র ফুটে উঠেছে, তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

কবি বিষ্ণু দে তাঁর ‘পরবাসী’ কবিতার প্রথম স্তবকগুলিতে বন্য প্রকৃতির এক অত্যন্ত মনোরম, রহস্যময় এবং প্রাণবন্ত ছবি এঁকেছেন।

বনের মাঝখানের আঁকাবাঁকা পথটিতে আলো-আঁধারির এক অপূর্ব ঝিকিমিকি পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সেই পথটি প্রকৃতির নিজস্ব তালে এঁকেবেঁকে চলে গেছে। রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারে বন্যপ্রাণীদের চোখ উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ওঠে এবং কচি কচি খরগোশেরা মনের আনন্দে নেচে লাফ দেয়। নিটোল টিলার ওপর ফুটে থাকা লাল পলাশ ফুলের ঝোপের আড়ালে হঠাৎ করেই বনময়ূর পুলকিত হয়ে নেচে ওঠে, যা দেখে কবির ‘কথক’ নৃত্যের কথা মনে পড়ে।

অন্যদিকে, নদীর বয়ে চলা স্রোতের শব্দ কবির কানে সোনালি সেতারের সুমধুর ধ্বনির মতো মনে হয়। সেই নদীর কিনারে রাতের নির্জনতায় চুপি চুপি জল খেতে আসে হরিণের দল। আর বনের ভেতরে চিতা বাঘের লুব্ধ ও হিংস্র চলার ছন্দের মধ্যে বন্যপ্রাণের আদিম ‘কথাকলি’ নৃত্যের উদ্দাম বেগ ফুটে ওঠে। এভাবেই বন্যপ্রাণী এবং নিসর্গ প্রকৃতির এক অনবদ্য মেলবন্ধন কবিতায় রূপ পেয়েছে।

3. “জঙ্গল সাফ, গ্রাম মরে গেছে…” – এই পঙ্‌ক্তির সূত্র ধরে আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতায় প্রকৃতির ধ্বংসলীলা এবং বন্যপ্রাণীদের বিপন্নতার যে রূপ কবিতায় ফুটে উঠেছে, তা আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

কবি বিষ্ণু দে ‘পরবাসী’ কবিতায় মানুষের আগ্রাসনে কিভাবে আদিম প্রকৃতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তার এক মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেছেন।

আধুনিক মানুষ নগর ও শিল্পের প্রসারের জন্য নির্বিচারে বনের পর বন কেটে সাফ করে ফেলছে। এর ফলে গ্রামগুলি তার স্বাভাবিক সজীবতা হারিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। আক্ষেপের বিষয় হলো, এত জঙ্গল ধ্বংস করার পরও সেখানে মানুষের জন্য কোনো নতুন শহরের পত্তন হয়নি। তার বদলে সেই গাছপালাহীন রুক্ষ প্রান্তরে আজ কেবল শুকনো হাওয়ার হাহাকার শোনা যায়।

বন জঙ্গল ধ্বংস হওয়ায় বন্যপ্রাণীরা আজ চরম বিপন্ন। মানুষের সীমাহীন লোভের শিকার হয়ে স্বাধীন বনময়ূর আজ বাজারে বিক্রির পণ্যে পরিণত হয়েছে। বনের হরিণেরা আজ স্বাধীনভাবে জলাশয়ে যেতে ভয় পায়, মানুষের চোখে পড়ার আতঙ্কে তারা চুপি চুপি জল খেতে আসে। চিতা বাঘ বা খরগোশেরা তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান হারিয়েছে। এভাবেই আধুনিক মানুষের স্বার্থপরতায় সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র আজ চরম ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

4. ‘পরবাসী’ কবিতার অন্তর্নিহিত মূল ভাব বা বক্তব্য নিজের ভাষায় গুছিয়ে লেখো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

কবি বিষ্ণু দে রচিত ‘পরবাসী’ কবিতাটির মূল ভাব হলো প্রাকৃতিক পরিবেশের ধ্বংসের কারণে আধুনিক মানুষের শেকড়বিচ্ছিন্ন ও আশ্রয়হীন অবস্থার মর্মান্তিক পরিণতি তুলে ধরা।

একসময় বাংলা ছিল গভীর অরণ্য, শান্ত নদী এবং স্বাধীন বন্যপ্রাণীতে পরিপূর্ণ এক সজীব বাসভূমি। কিন্তু যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মানুষ অন্ধ মোহে এবং অর্থের লোভে সেই বন কেটে সাফ করে দিয়েছে। নদী, গাছ, পাহাড়— প্রকৃতির এই মহামূল্যবান উপাদানগুলি আজ মানুষের কাছে তুচ্ছ বা গৌণ হয়ে পড়েছে। স্বাধীন ময়ূরকে আজ পণ্যে পরিণত করা হয়েছে।

কিন্তু প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষ নিজেও শান্তিতে নেই। কংক্রিটের সভ্যতায় মানুষের আত্মিক শান্তি হারিয়ে গেছে। তারা আজ নিজের দেশেই পরবাসী বা ভিনদেশি। প্রকৃতির এই ধ্বংসলীলার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ আজ মৌন ও অসহায়। তাই যাযাবরের মতো তাঁবু বয়ে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে মানুষের মনে আজ এই আক্ষেপই জেগে উঠেছে যে, তারা আবার কবে প্রকৃতির কোলে নিজেদের সজীব ও অকৃত্রিম বাসভূমি গড়ে তুলতে পারবে। পরিবেশ রক্ষার এই প্রচ্ছন্ন বার্তাই কবিতার মূল সুর।

5. “কেন এই দেশে মানুষ মৌন অসহায়?” – আধুনিক মানুষ কেন মৌন ও অসহায় হয়ে পড়েছে? এর ফলে মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়েছে? (2+3=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

মৌন ও অসহায় হওয়ার কারণ: আধুনিক মানুষ যান্ত্রিক সভ্যতা এবং অর্থের মোহে এতটাই অন্ধ হয়ে গেছে যে, তারা প্রকৃতির গুরুত্ব ভুলে গেছে। চোখের সামনে বন ধ্বংস হওয়া এবং ময়ূরের মতো বন্যপ্রাণীদের পণ্যে পরিণত হওয়ার মতো নির্মম ঘটনা ঘটলেও, যন্ত্রের দাপট এবং লোভী মানুষের ক্ষমতার কাছে সাধারণ মানুষ আজ প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছে। এই নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রতিবাদের ভাষার অভাবেই তারা মৌন ও অসহায় হয়ে পড়েছে।

মানুষের জীবনে প্রভাব: প্রকৃতির প্রতি এই অবহেলার কারণে মানুষের জীবনে চরম শূন্যতা নেমে এসেছে। নদী, গাছ ও পাহাড়ের মতো সজীব উপাদানগুলি তাদের জীবন থেকে গৌণ হয়ে গেছে। প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কংক্রিটের অরণ্যে বাস করতে গিয়ে মানুষ আত্মিক শান্তি হারিয়েছে। তাদের অবস্থা এখন যাযাবরের মতো হয়ে গেছে, যাদের কোনো স্থায়ী বা শান্তিময় ঠিকানা নেই। তাই মনের মধ্যে এক তীব্র শূন্যতা নিয়ে তাদের সারা দেশময় কেবল তাঁবু বয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে।

6. “পরবাসী কবে নিজ বাসভূমে গড়বে?” – ‘পরবাসী’ বলতে কবি কাদের বুঝিয়েছেন? তাদের এমন আক্ষেপ বা জিজ্ঞাসার কারণ কবিতা অবলম্বনে বিশ্লেষণ করো। (1+4=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

‘পরবাসী’ কারা: ‘পরবাসী’ বলতে কবি মূলত নিজের দেশেই বাস করা সেইসব আধুনিক মানুষদের বুঝিয়েছেন, যারা প্রকৃতির ধ্বংসের কারণে আজ শেকড়বিচ্ছিন্ন, আশ্রয়হীন এবং আত্মিক শান্তি থেকে বঞ্চিত।

আক্ষেপ বা জিজ্ঞাসার কারণ: মানুষ নিজের লোভ ও স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বনের পর বন কেটে কংক্রিটের ইমারত তৈরি করেছে। বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণস্থল আজ মানুষের আগ্রাসনে নিশ্চিহ্ন। কিন্তু প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষ নিজে শান্তিতে থাকতে পারেনি। তারা বুঝতে পেরেছে যে, গাছপালা ও নদীর স্নিগ্ধতা ছাড়া ইট-পাথরের শহরে আত্মার কোনো মুক্তি নেই।

নিজের জন্মভূমি আজ মানুষের কাছে এক অচেনা, রুক্ষ এবং প্রাণহীন জায়গায় পরিণত হয়েছে, যেখানে সে একজন ভিনদেশি বা ‘পরবাসী’ মাত্র। যাযাবরের মতো তাঁবু বয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষ ক্লান্ত। তাই ক্লান্ত ও শেকড়হীন মানুষের মনের গভীর থেকে আজ এই হাহাকার বা আক্ষেপ জেগে উঠেছে যে, এই ধ্বংসলীলা থামিয়ে তারা আবার কবে প্রকৃতির কোলে একটি সজীব, শান্ত এবং প্রকৃত বাসভূমি গড়ে তুলতে পারবে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার