শ্রেণি – বাংলা, তৃতীয় পাঠ, অধ্যায় -৪, পথচলতি – সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3
অধ্যায় 8: পথচলতি
(ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 3)
নিচের উক্তিগুলির উৎস, প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো:
1. “গয়াতে দেরাদুন এক্সপ্রেসে ওঠা গেল।” – বক্তা কে? তাঁর ট্রেনের কামরার পরিবেশ কেমন ছিল?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথচলতি’ গদ্যাংশ থেকে গৃহীত হয়েছে।
প্রসঙ্গ: লেখকের কলকাতা (হাওড়া) ফেরার যাত্রাপথের সূচনার কথা বলতে গিয়ে এই কথাটি বলা হয়েছে।
তাৎপর্য: বক্তা হলেন স্বয়ং লেখক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। তিনি গয়া স্টেশন থেকে দেরাদুন এক্সপ্রেসের তৃতীয় শ্রেণির কামরায় উঠেছিলেন। সেই কামরার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত কোলাহলপূর্ণ এবং ভিড়ে ঠাসা। সেখানে তিল ধারণের জায়গা ছিল না এবং মূলত দীর্ঘকায়, রুক্ষ চেহারার পাঠান বা কাবুলিওয়ালা যাত্রীদের ভিড়ই সেখানে বেশি ছিল।
2. “তারা তো অবাক।” – কারা অবাক হয়েছিল? তাদের অবাক হওয়ার কারণ কী ছিল?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথচলতি’ রচনা থেকে সংকলিত।
প্রসঙ্গ: লেখকের মুখে নিজেদের মাতৃভাষা শুনে পাঠান যাত্রীদের মানসিক অবস্থার কথা এখানে বলা হয়েছে।
তাৎপর্য: এখানে তৃতীয় শ্রেণির কামরায় উপস্থিত রুক্ষ চেহারার পাঠান বা কাবুলিওয়ালা যাত্রীদের অবাক হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তারা অবাক হয়েছিল কারণ, একজন সাধারণ বাঙালি বাবু (লেখক) তাদের মাতৃভাষা ‘পশতু’-তে অত্যন্ত সুন্দর ও নিখুঁতভাবে তাদের সাথে কথা বলা শুরু করেছিলেন। ভিনদেশি একজন মানুষের মুখে নিজেদের ভাষা শুনে তারা অত্যন্ত বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়েছিল।
3. “খুশহাল খান খটকের নাম শুনে তাদের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।” – খুশহাল খান খটক কে? তাঁর নাম শুনে পাঠানদের এমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল কেন?
উত্তর দেখো
উৎস: উক্তিটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘পথচলতি’ গদ্যাংশ থেকে গৃহীত।
প্রসঙ্গ: পাঠানদের নিজেদের মাতৃভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং গর্বের কথা বোঝাতে লেখক এ কথা বলেছেন।
তাৎপর্য: খুশহাল খান খটক হলেন পশতু ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। পাঠানরা পেশায় কাবুলিওয়ালা বা সাধারণ ব্যবসায়ী হলেও নিজেদের মাতৃভাষা পশতু এবং তার সাহিত্য নিয়ে তারা অত্যন্ত গর্ববোধ করত। তাই যখন একজন বাঙালি লেখকের মুখে তারা তাদের শ্রেষ্ঠ কবির নাম শুনল, তখন মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও গর্বে তাদের চোখ আনন্দে উজ্জ্বল বা জ্বলজ্বল করে উঠেছিল।
4. “বাবুজি, আপনি বসুন।” – কে, কাকে এই কথা বলেছিল? কেন বলেছিল?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথচলতি’ ভ্রমণকাহিনি থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: লেখকের ভাষাজ্ঞান ও আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে পাঠানদের আচরণের পরিবর্তনের দৃশ্য এখানে ফুটে উঠেছে।
তাৎপর্য: ট্রেনের ভিড় কামরায় উপস্থিত পাঠান যাত্রীরা লেখক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে সম্মান করে এই কথা বলেছিল। প্রথমে কামরার পরিবেশ খুব রুক্ষ ও অসহিষ্ণু থাকলেও, লেখক যখন পশতু ভাষায় তাদের সাথে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা শুরু করেন, তখন পাঠানরা তাঁর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়। ভিনদেশি ভাষার প্রতি লেখকের এই শ্রদ্ধা দেখে তারা খুশি হয়ে লেখককে আরাম করে বসার জায়গা করে দিয়েছিল।
5. “এদের কাছে আমি একজন আলেম বা পণ্ডিত ব্যক্তি।” – কাদের কাছে? কেন তারা লেখককে পণ্ডিত ব্যক্তি মনে করেছিল?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘পথচলতি’ গদ্যাংশ থেকে চয়ন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গ: পাঠান যাত্রীদের মনে লেখকের প্রতি যে গভীর শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছিল, তা বোঝাতেই এই উক্তি।
তাৎপর্য: ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণির কামরায় উপস্থিত পাঠান বা কাবুলিওয়ালা যাত্রীদের কাছে লেখক একজন আলেম বা পণ্ডিত ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। কারণ, একজন বাঙালি হয়েও লেখক সাবলীলভাবে পশতু ভাষায় কথা বলছিলেন এবং পশতু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি খুশহাল খান খটকের পাশাপাশি ফারসি কবি হাফিজের কবিতাও আবৃত্তি করছিলেন। তাঁর এই অগাধ ভাষাজ্ঞান দেখেই তারা লেখককে সম্মাননীয় পণ্ডিত মনে করেছিল।
6. “আমার এই পশতু বিদ্যার দৌড় বেশি নয়।” – বক্তার পশতু বিদ্যার দৌড় কতটুকু ছিল? তা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে কাজ চালিয়েছিলেন?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য পঙ্ক্তিটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথচলতি’ গদ্যাংশ থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ: নিজের ভাষাজ্ঞান সম্পর্কে লেখকের বিনয় এবং উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিতে গিয়ে এ কথা বলা হয়েছে।
তাৎপর্য: লেখক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় একজন ভাষাতত্ত্ববিদ হলেও, পশতু ভাষায় তাঁর খুব বেশি দখল ছিল না। তিনি কেবল কিছু সাধারণ শব্দ, বাক্য এবং পশতু সাহিত্যের কিছু প্রবাদ ও কবির নাম জানতেন। কিন্তু তাঁর আন্তরিকতা এবং সেই সীমিত জ্ঞানটুকু অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রয়োগ করার ফলেই তিনি পাঠানদের সাথে সুন্দরভাবে কথোপকথন চালিয়ে তাদের মন জয় করতে পেরেছিলেন।
7. “ফারসিতে বলতে শুরু করলুম…” – লেখক কী বলতে শুরু করেছিলেন? এর ফল কী হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘পথচলতি’ রচনা থেকে সংগৃহীত।
প্রসঙ্গ: পাঠানদের সাহিত্যপ্রীতি দেখে লেখক যখন ফারসি সাহিত্যের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, তখনকার ঘটনা এটি।
তাৎপর্য: পশতু ভাষার পর লেখক ফারসি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গজল রচয়িতা কবি হাফিজের লেখা সুন্দর একটি ফারসি কবিতা বা গজল আবৃত্তি করতে শুরু করেছিলেন। এর ফল হয়েছিল জাদুকরী। পাঠান যাত্রীরা সাহিত্যপ্রেমী হওয়ায় তারা অত্যন্ত আনন্দিত হয় এবং লেখকের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা বহুগুণ বেড়ে যায়। তারা লেখকের সাথে গলা মিলিয়ে সাহিত্যের আলোচনায় মেতে ওঠে।
8. “তারা আমাকে খুব খাতির করতে লাগলেন।” – কারা, কাকে খাতির করতে লাগলেন? এই খাতির করার কারণ কী ছিল?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথচলতি’ গদ্যাংশ থেকে নেওয়া হয়েছে。
প্রসঙ্গ: লেখকের পাণ্ডিত্য ও আন্তরিক ব্যবহারে মুগ্ধ পাঠানদের আচরণের কথা এখানে বলা হয়েছে।
তাৎপর্য: ট্রেনের কামরায় উপস্থিত রুক্ষ পাঠান বা কাবুলিওয়ালা যাত্রীরা লেখক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে খুব সম্মান বা খাতির করতে শুরু করেছিলেন। এর প্রধান কারণ ছিল, লেখক অহংকার বর্জন করে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার সাথে তাদের মাতৃভাষা পশতু এবং ফারসি সাহিত্যে তাদের সাথে আলোচনা করেছিলেন। মাতৃভাষার প্রতি একজন বাঙালির এই ভালোবাসা দেখেই তারা লেখককে অত্যন্ত খাতির করেছিলেন।
9. “পাঠানদের চরিত্র বড়ো অদ্ভুত।” – পাঠানদের চরিত্রের কোন্ অদ্ভুত দিকের কথা এখানে বলা হয়েছে?
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘পথচলতি’ গদ্যাংশ থেকে গৃহীত।
প্রসঙ্গ: পাঠানদের বাহ্যিক রুক্ষতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সাহিত্যপ্রীতির কথা বোঝাতে লেখক এই উক্তি করেছেন।
তাৎপর্য: পাঠানদের বাহ্যিক চেহারা অত্যন্ত দীর্ঘকায়, বলিষ্ঠ এবং রুক্ষ। তারা স্বভাবগতভাবে বদমেজাজি ও রূঢ় বলে পরিচিত। কিন্তু তাদের চরিত্রের অদ্ভুত দিকটি হলো, এত রুক্ষতার আড়ালেও তারা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং নিজেদের মাতৃভাষা পশতু ও ফারসি সাহিত্য নিয়ে তারা গভীরভাবে গর্ববোধ করে। সামান্য সাহিত্যের ছোঁয়াতেই তাদের ভেতরের এই কোমল রূপটি প্রকাশ পেয়ে যায়।
10. “তারা কাবুলিওয়ালা হয়েও সাহিত্যের সমঝদার।” – এই উক্তির মাধ্যমে পাঠানদের চরিত্রের কোন্ দিকটি প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য উক্তিটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথচলতি’ রচনা থেকে সংকলিত।
প্রসঙ্গ: সাধারণ ব্যবসায়ী পাঠানদের মননশীলতা এবং কবিতার প্রতি অনুরাগের কথা এখানে বলা হয়েছে।
তাৎপর্য: ‘কাবুলিওয়ালা’ বলতে সাধারণত সুদখোর, রুক্ষ এবং কড়া মেজাজের ব্যবসায়ীদের বোঝায়। কিন্তু লেখকের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, এই মানুষগুলো পেশায় কাবুলিওয়ালা বা নিরক্ষর হলেও তারা খুশহাল খান খটক বা হাফিজের মতো শ্রেষ্ঠ কবিদের কবিতা বোঝে এবং হৃদয় দিয়ে উপভোগ করে। অর্থাৎ, বাহ্যিক পেশা তাদের ভেতরের সাহিত্যবোধ বা মননশীলতাকে নষ্ট করতে পারেনি।
11. “ভাষার আদান-প্রদানে ধর্মের প্রাচীর ভেঙে গেল।” – কীভাবে এই প্রাচীর ভেঙেছিল তা সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর দেখো
উৎস: উদ্ধৃতিটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘পথচলতি’ গদ্যাংশ থেকে চয়ন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গ: হিন্দু বাঙালি লেখক এবং মুসলিম পাঠানদের মধ্যে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এ কথা বলা হয়েছে।
তাৎপর্য: লেখক ছিলেন হিন্দু বাঙালি আর পাঠানরা ছিল ভিনদেশি মুসলিম। তাদের মধ্যে ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির বিরাট পার্থক্য ছিল। কিন্তু লেখক যখন আন্তরিকতার সাথে তাদের মাতৃভাষা পশতু এবং ফারসি সাহিত্যে তাদের সাথে কথা বললেন, তখন সেই ভাষার জাদুতে উভয়ের মনের দূরত্ব ঘুচে যায়। ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাই তাদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলে এবং সমস্ত ধর্মীয় ও জাতপাতের প্রাচীর ভেঙে দেয়।
12. “ভাষার জ্ঞান আর আন্তরিকতা দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায়।” – ‘পথচলতি’ রচনা অবলম্বনে উক্তিটির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও。
উত্তর দেখো
উৎস: আলোচ্য বিষয়টি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথচলতি’ রচনার মূল ভাব থেকে গৃহীত।
প্রসঙ্গ: লেখকের অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার মূল চাবিকাঠির কথা এখানে বলা হয়েছে।
তাৎপর্য: ট্রেনের ভিড় কামরায় রুক্ষ পাঠানদের সাথে ঝগড়া না করে লেখক নিজের ভাষাজ্ঞানকে কাজে লাগিয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত বিনয় ও আন্তরিকতার সাথে তাদের মাতৃভাষায় কথা বলেছিলেন। এই ছোট্ট উদ্যোগটিই প্রমাণ করে যে, অহংকার ত্যাগ করে অপরের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানালে অত্যন্ত রুক্ষ ও অচেনা মানুষেরও হৃদয় জয় করা যায় এবং সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।